ঢাকা, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৫:৪৯:০৮ PM

উপন্যাস : প্রতিবন্ধী,পর্ব–৩

মান্নান মারুফ
04-02-2026 04:06:34 PM
উপন্যাস : প্রতিবন্ধী,পর্ব–৩

পর্ব–৩ : সুখের দাম

পারভেজ ভ্যান পেয়েছে—এই খবরটা পুরো কীর্তিপুর গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল।
কেউ অবাক হয়েছিল, কেউ ঈর্ষান্বিত, কেউ আবার মনে মনে হেসেছিল—“বোবা ছেলে আবার কী করবে!”

কিন্তু সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল একজন—নাজু।

নাজু বিশ্বাসই করতে পারেনি। সে দৌড়ে এসে ভ্যানটার পাশে দাঁড়িয়েছিল। নতুন ব্যাটারির গন্ধ, চকচকে বডি—সবকিছু তার চোখে স্বপ্নের মতো লাগছিল। সে পারভেজের দিকে তাকিয়ে হাততালি দিয়েছিল। মুখে শব্দ না থাকলেও চোখে যে আনন্দের ঝিলিক উঠেছিল, তা নাজু ঠিকই বুঝেছিল।

সেদিন রাতে নাজু নামাজ পড়েছিল। নামাজ শেষে হাত তুলে চুপচাপ দোয়া করেছিল—
“আল্লাহ, পারভেজকে ভালো রাখো। ও যেন কষ্ট না পায়।”

নাজুর দোয়ার কথা পারভেজ জানত না। কিন্তু সেই দোয়া যেন তার জীবনে একটু আলো হয়ে নেমে এসেছিল।

ভ্যানটাই বদলে দিয়েছিল সব।

অন্ধ বাবার আর ভিক্ষায় বসতে হতো না। সকালে বাবাকে ঘরেই বসিয়ে রেখে পারভেজ বের হতো কাজে। বাবার চোখে ছিল প্রশান্তি—ছেলের কাঁধে আর ভিক্ষার থালা নেই, আছে কাজের সম্মান।

পারভেজ ভ্যান চালাত ধীরে, সাবধানে। বাজারে মানুষ উঠত। কেউ মাল তুলত। কেউ দূরের গ্রামে যেত। প্রথম দিকে অনেকে ভরসা পায়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে সবাই বুঝে গিয়েছিল—পারভেজ বোবা হলেও দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়।

সে কারও সঙ্গে তর্ক করে না। বেশি ভাড়া চায় না। ইশারায় বোঝায়, হাসে।

দিন শেষে কিছু টাকা জমে। সেই টাকায় চাল আসে, ডাল আসে। কোনো কোনো দিন মাছও আসে। বাবার জন্য ওষুধ কেনা যায়। মায়ের চোখে নতুন আশার আলো দেখা দেয়।

এই সামান্য সুখই যেন পারভেজকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিল।

সে বুঝতে শুরু করেছিল—এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মানে শুধু নিশ্বাস নেওয়া নয়, সম্মান নিয়েও বাঁচা যায়।

কিন্তু সমাজ সবসময় এই সম্মান সহ্য করতে পারে না।

ভ্যান আসার পর থেকেই কিছু লোকের চোখে পারভেজ হয়ে ওঠে অস্বস্তির কারণ। বিশেষ করে যারা আগে ভিক্ষার টাকা দিত—তারা বলাবলি করতে থাকে,
“এখন আর দিলে কী হবে, কাজ তো করে!”

আর যারা নিজেরা ভ্যান চালায়—তাদের কারও কারও আয় কমে যায়। তাদের চোখে পারভেজ হয়ে ওঠে শত্রু।

ফিসফিস শুরু হয়।
“বোবা ছেলে এত ওপরে উঠছে কীভাবে?”
“কেউ না কেউ পেছনে আছে।”

পারভেজ এসব কথা শুনতে পায় না। কিন্তু পরিবেশের ঠান্ডা ভাবটা সে টের পায়। আগের মতো হাসি পায় না মানুষের কাছ থেকে।

এক সন্ধ্যায় ভ্যান চালিয়ে ফেরার সময় কয়েকজন যুবক তার পথ আটকে দাঁড়ায়। প্রথমে হাসে। তারপর কটু কথা বলে। কেউ ধাক্কা দেয়। পারভেজ ভয় পেয়ে যায়। হাত জোড় করে অনুনয় করে—কিছু না বলেও।

সেদিন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেটা ছিল সতর্কবার্তা।

নাজু সব বুঝতে পারে। সে পারভেজকে ইশারায় বোঝায়—সাবধানে থাকতে। পারভেজ মাথা নাড়ে।

কয়েক দিন পর রাত নামে অন্যরকম অন্ধকার নিয়ে।

পারভেজ সেদিন দেরি করে ফিরছিল। বাজার থেকে শেষ যাত্রী নামিয়ে সে একা ছিল। রাস্তা নির্জন। হঠাৎ পিছন থেকে কয়েকজন এসে ভ্যান থামায়।

এইবার আর হাসি ছিল না।

চিৎকারের শব্দ ওঠে—কিন্তু পারভেজের মুখ থেকে নয়। তার গলা বন্ধ। সে শুধু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। কেউ লাঠি তোলে। কেউ ঘুষি মারে। সে মাটিতে পড়ে যায়।

ভ্যানটা উল্টে পড়ে।

অন্ধকারের মধ্যে পারভেজের নিঃশব্দ আর্তনাদ হারিয়ে যায়।

সকালে গ্রামের লোক খবর পায়—খালের ধারে একটা লাশ পড়ে আছে।

লাশটা পারভেজের।

বোবা ছেলের শেষ কথাগুলো কেউ শোনেনি। কেউ জানেনি সে কী বলতে চেয়েছিল। তার চোখ খোলা ছিল—যেন এখনও প্রশ্ন করছে।

অন্ধ বাবা যখন খবরটা পায়, তখন তিনি বসে ছিলেন ঘরের কোণে। কেউ এসে বলেছিল,
“আপনার ছেলে আর নেই।”

বাবা প্রথমে বিশ্বাস করেননি। তিনি শুধু বলেছিলেন,
“ও আসবে। ও দেরি করে।”

কিন্তু পারভেজ আর আসেনি।

নাজু ছুটে এসেছিল। লাশের পাশে দাঁড়িয়ে সে চিৎকার করেছিল। তার কান্নার শব্দে গ্রাম কেঁপে উঠেছিল। সে বারবার বলছিল,
“ও কারও ক্ষতি করেনি!”

কেউ উত্তর দেয়নি।

ভ্যানটা পড়ে ছিল একপাশে—চাকা ভাঙা, ব্যাটারি ছিন্নভিন্ন। যে ভ্যান তাদের সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছিল, সেই ভ্যানটাই যেন সাক্ষী হয়ে রইল হত্যার।

অন্ধ বাবা ছেলের লাশ ছুঁয়ে কাঁদেনি। শুধু হাত বুলিয়েছিল। বলেছিল,
“আমার চোখ নেই, তোর মুখও আর দেখতে পারলাম না।”

এই পরিবার আবার অসহায় হয়ে পড়ল—আগের চেয়েও বেশি।

ভিক্ষা ফিরে এল। অভাব ফিরে এল।
কিন্তু পারভেজ আর ফিরল না।

তার নীরবতা এই সমাজকে একটুও লজ্জা দিল না।

আর প্রশ্নটা আবার মাথা তুলল—

এরা কি মানুষ ?

চলবে.........