চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ের প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার দরপত্রে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র মূল্যায়নে কারসাজির মাধ্যমে নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করা দুটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সব পণ্য সরবরাহ সম্পন্ন হওয়ার আগেই সরকারি বিল পরিশোধেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
১৪টি টেন্ডারে ৯ কোটি টাকার বেশি চুক্তি
সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪টি পৃথক আইটেমে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনার জন্য চলতি বছরের জানুয়ারিতে দরপত্র আহ্বান করে আন্দরকিল্লা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল।
দরপত্র মূল্যায়ন শেষে ১৫ এপ্রিল সাতটি, ৬ মে একটি, ৭ মে দুটি, ১৭ মে একটি এবং ১৯ মে তিনটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ৯ কোটি ২১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৬৬ টাকার চুক্তি সম্পাদিত হয়।
এর মধ্যে এমএসএম হেলথ কেয়ার ও এমএসএম বাংলাদেশ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান ছয়টি কার্যাদেশের মাধ্যমে মোট ৭ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৬ টাকার কাজ পায়। অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক রুমানা সুলতানা মৌ।
পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই কার্যাদেশের অভিযোগ
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী যে ধরনের কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা (Experience Certificate) প্রয়োজন ছিল, তা প্রতিষ্ঠান দুটির ছিল না। এছাড়া এর আগে এত বড় অঙ্কের সরকারি কাজ বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাও তাদের নেই।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন সরকারি টেন্ডারে অংশ নিলেও তারা আগে কখনও প্রতিষ্ঠান দুটিকে দেখেননি। একই মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কার্যাদেশ দিতে দরপত্র মূল্যায়নে নানা অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কয়েকজন ঠিকাদার পৃথকভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসাইন, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন খালেদ এবং স্টোরকিপার শহীদুল আলমের বিরুদ্ধে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এছাড়া একজন ড্যাব (ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) নেতা এবং একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তার নামও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্টদের কল রেকর্ড (কললিস্ট) যাচাই করলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যেতে পারে।
ঠিকাদারের অভিযোগ
মেসার্স জম জম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. দিদারুল আলম বলেন,
"আমি টেন্ডারে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠানকে নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করা হয়। কী কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা লিখিতভাবে জানতে আবেদন করলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দেয়নি। অথচ দ্রুত এমএসএম বাংলাদেশ ও এমএসএম হেলথ কেয়ারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। পরে আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দুদকে লিখিত অভিযোগ করেছি।"
তিনি আরও বলেন,
"টেন্ডারের অভিজ্ঞতার যে শর্ত ছিল, তা প্রতিষ্ঠান দুটির নেই। আগে তারা এত বড় কাজও করেনি। পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে নতুন নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।"
দিদারুল আলম আরও প্রশ্ন তোলেন,
"একই ধরনের কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও একটি টেন্ডারে কোনো প্রতিষ্ঠানকে নন-রেসপনসিভ করা হয়েছে, আবার অন্য টেন্ডারে সেই একই প্রতিষ্ঠানকে রেসপনসিভ ঘোষণা করা হয়েছে। যদি কোনো ডকুমেন্টে সমস্যা থাকে, তাহলে একটিতে নন-রেসপনসিভ আর অন্যটিতে রেসপনসিভ হলো কীভাবে?"
আরও কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ
এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মেসার্স এম রহমান অ্যান্ড কোং-এর স্বত্বাধিকারী মো. নাছির উদ্দিন চৌধুরী, মেসার্স সাদমান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ আবু তালেব এবং মেসার্স কাশেম অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী এম. এ. কাশেম।
এম. এ. কাশেম বলেন,
"অর্থবছর শুরু হয় জুলাই মাসে এবং বরাদ্দও তখনই আসে। কিন্তু কেনাকাটা করা হয়েছে অর্থবছরের একেবারে শেষদিকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুরুতে পুরো টেন্ডার ম্যানুয়ালি করার জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চেয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয় সেই অনুমতি দেয়নি।"
কম দরদাতাকে বাদ দিয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি সরবরাহের (টেন্ডার আইডি-১২০৬০৭২) জন্য ২ কোটি ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৮৭৬ টাকার কার্যাদেশ পায় এমএসএম হেলথ কেয়ার।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই টেন্ডারে অংশ নেওয়া আলী অ্যাসোসিয়েটসকে নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, এমএসএম হেলথ কেয়ার প্রয়োজনীয় পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করলেও তাদের রেসপনসিভ ঘোষণা করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
একই টেন্ডারে মেসার্স আলমগীর অ্যান্ড ব্রাদার্স ১ কোটি ৮৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯২ টাকার দরপ্রস্তাব দিয়ে ফাইন্যান্সিয়ালি রেসপনসিভ হলেও তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। বরং প্রায় ১৭ লাখ ৯৩ হাজার ২৮৪ টাকা বেশি মূল্যে এমএসএম হেলথ কেয়ারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির টেন্ডারে নন-রেসপনসিভ ঘোষিত আলী অ্যাসোসিয়েটস একই সময়ে ২৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৫৯ টাকার আসবাবপত্র সরবরাহের (টেন্ডার আইডি-১২০৬০৭৩) কার্যাদেশ পায়। এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
পণ্য সরবরাহের আগেই বিল পরিশোধের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সব ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী গ্রহণ করা হয়েছে—এমন প্রত্যয়ন দিয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠায়।
গত ২২ জুন বিলগুলো অনুমোদন করা হয় এবং আইবাস (Integrated Budget and Accounting System-IBAS)-এর মাধ্যমে ঠিকাদারদের হিসাবে অর্থ ছাড় করা হয়।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, বিল অনুমোদন ও অর্থ পরিশোধের পরদিন, অর্থাৎ ২৩ জুন দুপুরে এমএসএম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহ করতে দেখা যায়।
চালানপত্রে মিলেছে অসঙ্গতি
২৩ জুন দুপুর সোয়া ২টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের "ঢাকা মেট্রো-ম-১১-৫৩৪৩" নম্বরের একটি পিকআপ ভ্যানে করে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের তিনটি ডেলিভারি চালান পর্যালোচনায় দেখা যায়, চালানগুলো ১৬, ১৮ ও ২০ জুন ইস্যু করা হলেও হাসপাতালের স্টোরকিপারের গ্রহণ-সংক্রান্ত স্বাক্ষর রয়েছে ২৩ জুন তারিখে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, যদি ২২ জুনই সব পণ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে মর্মে প্রত্যয়ন দিয়ে বিল পরিশোধ করা হয়ে থাকে, তাহলে ২৩ জুন একই চালানের ওষুধ হাসপাতালে গ্রহণের প্রয়োজন হলো কেন? এই অসঙ্গতি পুরো ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।