ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৭:৩৯:৪৪ PM

দুই পক্ষের বিরোধে বিপাকে ৭০০ দোকান মালিক

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
11-07-2026 06:25:28 PM
দুই পক্ষের বিরোধে বিপাকে ৭০০ দোকান মালিক

রাজধানীর হাতিরপুলের মোতালিব প্লাজা দোকান মালিক সমিতির নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। এই বিরোধের কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ মোবাইল ফোনের বাজার হিসেবে পরিচিত মোতালিব প্লাজার প্রায় ৭০০ দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রয়াত বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খন্দকার আকতার হামিদ পবন এবং সাবেক যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান বাচ্চু।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সমিতির কমিটি নিয়ে চলমান দ্বন্দ্বের কারণে বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। দুই পক্ষের বিরোধ, পাল্টাপাল্টি দাবি এবং প্রশাসনিক জটিলতায় ব্যবসা পরিচালনায় নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। অনেকের আশঙ্কা, দ্রুত সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের ব্যবসায়িক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

যেভাবে বিরোধের সূচনা

জুলাই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন কমিটির শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে গেলে ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর সাধারণ সভার মাধ্যমে ৩১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এতে সভাপতি নির্বাচিত হন মাহবুবুর রহমান বাচ্চু এবং সাধারণ সম্পাদক হন শাহ আলম ব্যাপারী। কমিটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় দুই বছর।

তবে শুরু থেকেই এই কমিটির বিরোধিতা করেন খন্দকার আকতার হামিদ পবন ও তাঁর অনুসারীরা। পরে সমিতির তহবিলে থাকা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকার নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সভাপতি মাহবুবুর রহমান বাচ্চু এবং সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম ব্যাপারীর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে শাহ আলম ব্যাপারী পবনের সঙ্গে যুক্ত হন।

গত ১৬ মে সন্ধ্যায় বহিরাগতদের নিয়ে মোতালিব প্লাজায় প্রবেশ করে সমিতির কার্যালয় দখলের অভিযোগ ওঠে পবনের বিরুদ্ধে। পরদিন তিনি নিজেকে আহ্বায়ক এবং শাহ আলম ব্যাপারীকে সদস্যসচিব করে নতুন কমিটির ঘোষণা দেন। এরপর থেকেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

আদালতের দ্বারস্থ বাচ্চু

নতুন কমিটি গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ৯ জুন হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন মাহবুবুর রহমান বাচ্চু। ১১ জুন আদালত পরবর্তী কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন যাতে কোনো পক্ষ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে বর্তমান কমিটিকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার, শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ পাঁচ বিবাদীকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। পাশাপাশি ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তিরও নির্দেশ দেওয়া হয়।

মাহবুবুর রহমান বাচ্চুর অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর দাবি, তিনি সমিতির কার্যালয়ে যেতে পারছেন না এবং তাঁর সমর্থকদের মারধরের শিকার হতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সমিতির তহবিলের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন ভাড়ার অর্থও সঠিকভাবে সমিতির কোষাগারে জমা হচ্ছে না।

পাল্টা দাবি পবন ও শাহ আলমের

অন্যদিকে খন্দকার আকতার হামিদ পবন দাবি করেন, মাহবুবুর রহমান বাচ্চু কখনো বৈধভাবে সভাপতি নির্বাচিত হননি। তাঁর অভিযোগ, বাচ্চু আদালতের আদেশের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। পবনের ভাষ্য, তিনি বৈধভাবেই কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং ব্যবসায়ীদের সমর্থন পাচ্ছেন।

পবন আরও দাবি করেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস তাঁর ঘোষিত কমিটি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। একই দাবি করেন সদস্যসচিব শাহ আলম ব্যাপারীও। তাঁর বক্তব্য, ৫ আগস্টের পর মাহবুবুর রহমান বাচ্চু নিজেকে সভাপতি ঘোষণা করেছিলেন এবং সেই কমিটির কোনো আইনগত বৈধতা ছিল না।

সমঝোতার চেষ্টা প্রশাসনের

রিটকারী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সিদ্দিক উল্লাহ মিয়া জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এখনো কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে তিনি দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির আশা প্রকাশ করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এস কে জাহিদুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে নিয়ে একাধিকবার সমঝোতার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কখনো এক পক্ষ, কখনো অন্য পক্ষ উপস্থিত না হওয়ায় আলোচনা সফল হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলেও তিনি জানান।

তহবিল নিয়েই মূল দ্বন্দ্ব

১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মোতালিব প্লাজায় বর্তমানে প্রায় ৭০০টি মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তিপণ্যের দোকান রয়েছে। দোকান মালিকদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ, জেনারেটর, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য খাতে প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়। এছাড়া বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন স্পেস ভাড়া থেকেও সমিতির বড় অঙ্কের আয় হয়।

ব্যবসায়ীদের মতে, এই বিপুল তহবিলের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই মূলত বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। যে অর্থ ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের কল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা, তা এখন রাজনৈতিক প্রভাব ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সংকট সমাধানের দাবি জানিয়েছেন মোতালিব প্লাজার সাধারণ ব্যবসায়ীরা।