ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৯:৩৩:০৭ PM

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধস, প্রাণ গেল ৮ ছাত্রীর

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
08-07-2026 08:05:46 PM
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধস, প্রাণ গেল ৮ ছাত্রীর

কক্সবাজারের উখিয়ায় টানা অতিবৃষ্টির কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি মাদরাসার ওপর পাহাড় ধসে অন্তত আট ছাত্রী নিহত হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল প্রায় ৩টার দিকে উখিয়া উপজেলার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর এ-৭/৩ ব্লকে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু শিক্ষার্থী আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ১৩ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে চারজন ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়। আহত পাঁচ শিশুকে ক্যাম্প-৩-এর জিকে (১) হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিহতদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা জানান, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় লোকজন যৌথভাবে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পাহাড় ধসের সময় প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী মাদরাসার ভেতরে ছিল এবং তাদের মধ্যে অনেকে এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে।

প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সাদেক বলেন, ঘটনাস্থলে মেয়েদের একটি মাদরাসা এবং তার ওপর একটি মক্তব ছিল। মাটি ভরাট করে নির্মিত মাদরাসাটির পাশের পাহাড় টানা বৃষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পাহাড়ের ঢাল ধসে ভবনটির ওপর আছড়ে পড়লে মুহূর্তেই ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটে।

রোহিঙ্গা মাঝি দিল মোহাম্মদ জানান, উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। হিফজখানার ভেতরে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এর আগে সোমবার (৬ জুলাই) দিবাগত রাতে উখিয়ার তিনটি পৃথক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে আটজন নিহত হন। রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে পাহাড় ধসে মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন।

একই রাতে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটির নিচে চাপা পড়ে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড় ধসে উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদ (৩) নিহত হন।

সর্বশেষ এ দুর্ঘটনায় গত কয়েক দিনে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে।

আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, মানবিক সংকটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালু এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

এদিকে একই সময়ে কক্সবাজার সদর উপজেলার সাত্তারঘোনা, পেকুয়া এবং পরদিন দরিয়ানগর এলাকায় পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড় ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল আছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়া আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

জেলা প্রশাসন জানায়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার সব সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা ও বন্যাকবলিত নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারীদের দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার ও জরুরি সহায়তার জন্য একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক সহায়তার জন্য ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত আটজনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার অভিযান চলমান রয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে।