ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১১:৫৩:১৮ AM

বারুইপুরে কিশোরী হত্যা: ময়নাতদন্তে নতুন মোড়

কলকাতা ব্যুরো
07-07-2026 10:39:16 AM
বারুইপুরে কিশোরী হত্যা: ময়নাতদন্তে নতুন মোড়

সম্প্রতি কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির বারুইপুরে এক কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে। তদন্তকারী পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, কিশোরীকে হত্যা করার পর নয়, বরং জীবিত অবস্থাতেই বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তার ফুসফুসে কাদামিশ্রিত পানি পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের মতে, মৃত্যুর পর পানিতে ফেলে দিলে সাধারণত ফুসফুসে এভাবে পানি প্রবেশ করে না। ডুবে মৃত্যুর ক্ষেত্রেই এমন লক্ষণ দেখা যায়। ফলে পানিতে ফেলার সময় কিশোরী জীবিত ছিল বলে পুলিশের ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।

ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিশোরীর যৌনাঙ্গে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যা যৌন নির্যাতনের ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়া মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের মতে, ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করা অথবা শক্ত কোনো স্থানে মাথা আছড়ে পড়ার ফলে এমন ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। ওই আঘাত থেকে ব্যাপক রক্তক্ষরণ হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং পানিতে ডুবে শ্বাসরোধ—এই দুটি কারণ মিলেই কিশোরীর মৃত্যুর সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁদের ধারণা, শনিবার গভীর রাতেই কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে।

ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে তদন্তকারীরা পুরো ঘটনার পুনর্গঠন করার চেষ্টা করছেন। এখন পর্যন্ত তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তদন্তকারীরা।

পুলিশের হাতে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে সূর্যপুর বাজারের প্রধান সড়ক দিয়ে ওই কিশোরী হেঁটে যাচ্ছিল। তার কয়েক কদম পেছনে লাল টি-শার্ট পরা এক যুবককে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা ওই যুবককে প্রভাস মণ্ডল হিসেবে শনাক্ত করেন। পরদিন রোববার সকাল প্রায় ৭টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটি পুকুর থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রভাস মণ্ডল এলাকায় মাদকাসক্ত ও বেকার যুবক হিসেবে পরিচিত। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই ঘটনায় জড়িত আরও কয়েকজনের নাম জানতে পারে পুলিশ। তবে তদন্তকারীদের দাবি, প্রভাসের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে।

প্রথমে তিনি ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করলেও পরে জানান, চারজন ব্যক্তি তার কাছ থেকে কিশোরীকে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে আনন্দ সর্দার নামে একজনকে তিনি চিনতেন বলে জানান। প্রভাসের দাবি, আনন্দ কিশোরীকে অপহরণ করে তার পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করার পরিকল্পনা করেছিলেন।

তবে তদন্তকারীদের মতে, প্রভাস এখনও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন। এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেন, আনন্দই কিশোরীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন। কিন্তু তদন্তকারীদের প্রশ্ন, যদি তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকেন, তাহলে হত্যার পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি জানলেন কীভাবে? একইভাবে মরদেহ কোথায় ফেলা হয়েছে, সে তথ্যও তিনি কীভাবে জানলেন—সেই প্রশ্নেরও সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার অন্যদের বক্তব্যেও একই ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। এখন পর্যন্ত তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় অভিযুক্তরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যৌন নির্যাতনের পর কিশোরীকে কেন হত্যা করা হলো, তা নিয়ে তদন্তকারীরা দুটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন। প্রথমত, ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তরা একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় কিশোরী অভিযুক্তদের চিনে ফেলেছিল। ফলে পরিচয় প্রকাশের আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, শনিবার রাত থেকেই কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন। এলাকাজুড়ে খোঁজাখুঁজির খবর অভিযুক্তদের কাছেও পৌঁছে যায়। ধরা পড়ার ভয়ে তারা কিশোরীর মাথায় আঘাত করে এবং পরে তাকে বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দেয়। তদন্তকারীদের ধারণা, মাথায় গুরুতর আঘাত পেলেও সে তখনও জীবিত ছিল; সম্ভবত অচেতন অবস্থায় তাকে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।

এদিকে, নির্যাতিতার এক প্রতিবেশী দাবি করেছেন, মরদেহ যে বস্তায় ছিল সেটি তার দিয়ে বাঁধা হলেও ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর ভাষ্য, ‘মনে হচ্ছে, বস্তা থেকে বেরিয়ে আসার শেষ চেষ্টা করেছিল মেয়েটি।’

ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এদিকে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশ অভিযোগ করেছেন, বিচার দাবিতে বিক্ষোভ করতে গেলে পুলিশ বাধা দিয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং চূড়ান্ত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।