ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৮:৫৬:২৬ PM

সম্প্রসারণের সাথে জামায়াতের বাড়ছে নতুন চ্যালেঞ্জ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
02-07-2026 07:33:30 PM
সম্প্রসারণের সাথে জামায়াতের বাড়ছে নতুন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের একটি আদর্শিক, ক্যাডারভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত হয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দলটি কঠোর সাংগঠনিক নীতি, ধাপে ধাপে সদস্য গঠন, আদর্শভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং গোপন ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের ঐতিহ্য অনুসরণ করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলটির অভ্যন্তরে শৃঙ্খলাভঙ্গ, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য, বিদ্রোহী প্রার্থী, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার এবং নতুন সদস্যদের আচরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই সঙ্গে নির্বাচিত কয়েকজন জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে ওঠা বিতর্কও দলটির দীর্ঘদিনের সুশৃঙ্খল ভাবমূর্তিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দলীয় নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ১৭ বছর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সাংগঠনিক কার্যক্রমে বাধা এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে আদর্শিক চর্চা আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। একই সময়ে দলটির সাংগঠনিক বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন সদস্য ও সমর্থকদের কার্যক্রম কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান বিতরণকে কেন্দ্র করে একটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ওঠে যে অনুদানপ্রাপ্তদের তালিকায় তাঁর মেয়ের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অভিযোগ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। পরে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে বরখাস্ত করা হয়। যদিও এ ঘটনায় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য প্রকাশ হয়নি, তবু ঘটনাটি দলীয় জবাবদিহি ও প্রশাসনিক তদারকির বিষয়টিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

এর আগে গত ২৩ জুন রাজধানীর ধানমন্ডিতে স্থানীয় জামায়াতের একটি বিক্ষোভ মিছিল শেষে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করে। ঘটনার পর দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে এবং অভিযুক্ত চার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে। একই সঙ্গে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। দলটির এই পদক্ষেপ শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানের বার্তা দিলেও, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি দলীয় ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার একাধিক ঘটনা সামনে আসে। কয়েকটি আসনে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেন। সুনামগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহের কয়েকটি আসনে এমন ঘটনা ঘটে। কোথাও সদস্যপদ বাতিল, কোথাও বহিষ্কার এবং কোথাও পুরো জেলা কমিটি বিলুপ্ত করার মতো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দলটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিদ্রোহী প্রার্থীর ঘটনাও আলোচনায় আসে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শৃঙ্খলা রক্ষার বার্তা দিলেও, স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় দলীয় সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যে তদবির ও প্রচারণা চালানোর অভিযোগও উঠেছে। দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমোদন না থাকলেও কিছু ব্যক্তি নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা শুরু করেন। এতে বোঝা যায়, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরও দলীয় শৃঙ্খলা শতভাগ কার্যকর রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রকাশ্যে নেতাকর্মীদের সতর্ক করেন। তিনি বলেন, কেউ যদি মনে করেন যে তাঁকেই জনপ্রতিনিধি হতে হবে, তাহলে তিনি ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিগত পদলাভের আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে আদর্শ ও সংগঠনের প্রতি আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

দলের একাধিক শীর্ষ নেতা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, জানিয়েছেন যে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই আদর্শিক বিশ্বাসের চেয়ে সম্ভাব্য রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে দলে যোগ দিতে আগ্রহী হচ্ছেন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান কিংবা অন্যান্য পদে প্রার্থী হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের আদর্শভিত্তিক সাংগঠনিক সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন যোগদানকারীদের প্রত্যাশার একটি পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি সরাসরি পূর্ণ সদস্য হতে পারেন না। প্রথমে সহযোগী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। এরপর নির্ধারিত ধর্মীয় ও সাংগঠনিক পাঠ সম্পন্ন করে কর্মী হওয়ার সুযোগ আসে। পরবর্তী ধাপে রুকন হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক বই অধ্যয়ন, কোরআন তিলাওয়াত, জামাতে নামাজে অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক কাজের নিয়মিত প্রতিবেদন এবং নতুন কর্মী তৈরির মতো একাধিক শর্ত পূরণ করতে হয়। এই ধাপগুলো অতিক্রম করার পরই নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। একইভাবে আমিরসহ গুরুত্বপূর্ণ পদেও গোপন ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয় এবং কেউ নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন না।

তবে দলীয় সূত্রের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সাংগঠনিক সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কারণে এই কঠোর প্রক্রিয়া কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে তুলনামূলক দ্রুত সহযোগী সদস্য গ্রহণ করা হয়। ফলে এমন কিছু ব্যক্তি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক প্রস্তুতি বা সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ছিল না। এর প্রভাব এখন স্থানীয় পর্যায়ে দৃশ্যমান হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা মনে করছেন।

নির্বাচনী বাস্তবতায় আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। একটি সংসদীয় আসনে কার্যকর নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকের প্রয়োজন হয়। কেবল দলীয় সদস্যদের মাধ্যমে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক অদলীয় ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হন। নির্বাচনের পর তাঁদের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলছেন, যা পুরোনো সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব নতুন বলয়ই দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি করছে।

জামায়াতের গঠনতন্ত্রে ব্যক্তিগতভাবে দলীয় পদ বা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কোনো সদস্য নিজ উদ্যোগে ভোট চাইতে বা নিজের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে এই নীতি কার্যকর থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন নেতার মধ্যে এ নিয়ম লঙ্ঘনের প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের পর ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সুনামগঞ্জ-১ আসনে জোটের শরিক নেজামে ইসলাম পার্টির জন্য আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও জেলা আমির তোফায়েল আহমদ শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। একইভাবে নরসিংদী-২ আসনে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার পরও জেলা পর্যায়ের নেতার পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘটনা দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। কুমিল্লার একটি আসনে সম্ভাব্য দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বিব্রত করে এবং শেষ পর্যন্ত আসনটি জোটের শরিকের কাছে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুটি জেলা কমিটি বাতিল করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন কমিটি গঠন না করে আপাতত সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক অঞ্চলের দায়িত্বশীল নেতারা কার্যক্রম তদারকি করছেন।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্রুত সাংগঠনিক সম্প্রসারণ জামায়াতে ইসলামীর জন্য যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে, তেমনি সেই সম্প্রসারণ দলটির দীর্ঘদিনের আদর্শিক কাঠামো ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। দলীয় নেতৃত্ব কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে নতুন সদস্যদের আদর্শিক প্রশিক্ষণ, তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর তদারকি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে দলটির জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।