বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য প্রণীত এমপিও নীতিমালায় একই সঙ্গে একাধিক লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকার সুযোগ নেই। নীতিমালা অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সাংবাদিকতা, ওকালতি কিংবা অন্য কোনো লাভজনক পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন না। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে এমপিও সুবিধা বাতিলসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিধানও রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং একই সঙ্গে শিক্ষকতার বেতন-ভাতাও গ্রহণ করছেন কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এমনই একটি ঘটনায় বিষয়টি স্পষ্ট করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। অধিদপ্তর জানিয়েছে, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক একই সময়ে শিক্ষকতার এমপিও সুবিধা এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সম্মানী ভাতা—উভয়টি একসঙ্গে গ্রহণ করতে পারবেন না। তাকে যেকোনো একটি সুবিধা বেছে নিতে হবে। একই সঙ্গে দুই কর্মস্থল থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের সুযোগ নেই।
সম্প্রতি নওগাঁ জেলা প্রশাসনের পাঠানো একটি চিঠির জবাবে মাউশি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়। একই সঙ্গে অধিদপ্তরের আইন শাখার মতামত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বগুড়া জেলার আদমদিঘী উপজেলার ঈশ্বরপূর্ণ জয় পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জাহিদুর রহমান নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলার ৪ নম্বর পারইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি চেয়ারম্যানের সম্মানী ভাতা গ্রহণের বিষয়ে প্রাপ্যতা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্টীকরণ চান। বিষয়টি নওগাঁ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হলে অধিদপ্তর আইনি মতামতের জন্য নথিটি আইন শাখায় প্রেরণ করে।
অধিদপ্তরের আইন শাখা নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানায়, এ বিষয়ে অধিদপ্তরের আইন উপদেষ্টা গত ১৪ জুন লিখিত মতামত প্রদান করেন। ওই মতামতের সারাংশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয় এমপিও সুবিধা গ্রহণ করবেন, অথবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সম্মানী ভাতা গ্রহণ করবেন; কিন্তু একই সময়ে দুটি আর্থিক সুবিধাই গ্রহণ করা যাবে না।
আইন উপদেষ্টার ইংরেজি মতামতের বাংলা সারাংশে বলা হয়েছে, ‘এই প্রেক্ষাপটে আমাদের মতামত হলো, তিনি হয় তার এমপিও ভাতা অথবা ইউপি চেয়ারম্যানের সম্মানী ভাতা গ্রহণ করবেন; কিন্তু একই সঙ্গে উভয় ভাতা গ্রহণ করতে পারবেন না।’
মাউশি আরও উল্লেখ করেছে, এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারী একই সঙ্গে দুটি লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারেন না। ফলে কোনো শিক্ষক যদি এমপিও সুবিধা গ্রহণ অব্যাহত রাখেন, তাহলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রাপ্য সম্মানী ভাতা গ্রহণের অধিকারী হবেন না। একইভাবে চেয়ারম্যান হিসেবে সম্মানী গ্রহণ করতে চাইলে তাকে এমপিও সুবিধা পরিত্যাগ করতে হবে।
অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, একই সময়ে দুই কর্মস্থল থেকে সরকারি অর্থ বা ভাতা গ্রহণের কোনো সুযোগ আইন বা নীতিমালায় নেই। তাই আইন শাখার মতামতের আলোকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এমপিও নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষক-কর্মচারীদের পূর্ণকালীনভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে একাধিক লাভজনক পদে দায়িত্ব পালন করলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সে কারণেই এমপিও নীতিমালায় এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষকের সাংবিধানিক বা আইনগত অধিকার থাকতে পারে। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর যদি তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন এবং সেই পদে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলে একই সময়ে শিক্ষকতার এমপিও সুবিধা গ্রহণ নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। মাউশির সাম্প্রতিক ব্যাখ্যা ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ব্যাখ্যার ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্যমান বিভ্রান্তি দূর হবে এবং একই সঙ্গে নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সহজ হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মাউশির এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হলো—একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক একই সময়ে শিক্ষকতার এমপিও সুবিধা এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সম্মানী ভাতা একযোগে গ্রহণ করতে পারবেন না। দুটি লাভজনক পদ থেকে একসঙ্গে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের সুযোগ এমপিও নীতিমালায় নেই।