চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য কমাতে পারলে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব বলে মনে করেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তার মতে, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসায়ী ও করদাতাদের আস্থা বাড়বে। এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দেওয়ার আগ্রহও বাড়বে এবং রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের করদাতারা বর্তমানে একাধিক স্তরের চাপের মুখে পড়ছেন। একজন করদাতাকে শুধু সরকারি কোষাগারে কর দিলেই শেষ হয় না; এর বাইরে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন পক্ষকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়, যা চাঁদাবাজি ও অনিয়মের মাধ্যমে আদায় করা হয়। এতে প্রকৃত কর ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
জামায়াত আমির বলেন, যদি করদাতাদের জন্য এমন একটি নিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করা যায়, যেখানে তারা শুধু একবারই বৈধভাবে কর প্রদান করবেন এবং কোনো অতিরিক্ত চাপ থাকবে না, তাহলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদানে আগ্রহ বাড়বে। এতে রাজস্ব আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করে শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতি আস্থা থাকলে ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে কর দিতে আগ্রহী হন।
উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ টেনে জামায়াত আমির বলেন, সেখানে করদাতারা নিরাপদ পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদান করেন।বর্তমান জুলাই-জুন ভিত্তিক অর্থবছর পরিবর্তন করে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিক অর্থবছর চালুর প্রস্তাবও দেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। বলেন, আমাদের ফিসকাল ইয়ার জুলাই থেকে জুন। জুন মাসে বর্ষা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থাকে। তাই ফিসকাল ইয়ারকে ক্যালেন্ডার ইয়ারের সঙ্গে সমন্বয় করা হলে বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও আর্থিক পরিকল্পনায় আরও সমন্বয় আসবে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমও আরও কার্যকর হবে।
বক্তব্যে জাতীয় সংসদে একে অপরকে ‘কুচকুচ’ করে কাটার পর আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানোর মানসিকতা পরিহার করার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।
শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দল সংসদের দুটি চাকার মতো। একটি চাকা অচল হলে পুরো সংসদই অকার্যকর হয়ে পড়বে। তাই বিভাজনের রাজনীতি নয়, পারস্পরিক সম্মান ও গঠনমূলক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
‘সংসদ মূলত দুটি চাকার ওপর চলে। একটি সরকারি দল, অন্যটি বিরোধী দল। যেকোনো একটি চাকা অচল হয়ে গেলে পুরো যানবাহনই অচল হয়ে পড়বে। তাই এই দুই চাকায় পিন বা পেরেক মেরে ফুটো করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সংসদে ‘কুচকুচ’ করে কাটার পর আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানোর যে মানসিকতা, সেই বিভাজনের যন্ত্র ফেলে দিতে হবে।’
জামায়াত আমির বলেন, সরকারি দলের সব অভিপ্রায় বিরোধী দল চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে না। আবার সরকার ভালো কোনো উদ্যোগ নিলে বিরোধিতার জন্যই তার বিরোধিতা করা হবে না। সরকারি দলকে বিরোধী পক্ষকে সম্মান করতে হবে, আর বিরোধী দলকেও যৌক্তিক বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার মানসিকতা রাখতে হবে।
সংসদ কোনো তোষামোদের জায়গা নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এটি দায়িত্ব পালনের জায়গা। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে সংসদে ব্যক্তিকে খুশি করতে গান, কবিতা বা স্বপ্নবিলাস করার যে সংস্কৃতি অতীতে ছিল, তা আর চলতে পারে না।
ব্যক্তিকে খুশি করতে গিয়ে অন্যকে আঘাত করা এবং চরিত্র হননের যে ‘ব্যাড কালচার’ ছিল, তা পুরোপুরি বন্ধ করতে স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান জামায়াত আমির।