ঢাকা, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
সময়: ০১:৩৭:০৬ PM

লক্ষীপুরের চার হত্যার,উপন্যাস”শেষ আলো”

মান্নান মারুফ
27-06-2026 11:40:54 AM
লক্ষীপুরের চার হত্যার,উপন্যাস”শেষ আলো”

পর্ব-৬
ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে টিনের চালের ওপর এসে পড়েছে।

রাতের অস্বস্তিটা যেন সকালের আলোয় কিছুটা মিলিয়ে গেছে। শাহানা বেগম ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়লেন। সিজদা থেকে উঠে দীর্ঘক্ষণ দুই হাত তুলে দোয়া করলেন।

"হে আল্লাহ, আমার সন্তানদের ভালো রেখো।"

প্রতিদিনের মতোই তিনি রান্নাঘরে গেলেন।

চুলায় আগুন জ্বলল।

হাঁড়িতে ভাত চাপানো হলো।

ডালের পাতিল থেকে ধোঁয়া উঠতে লাগল।

ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল পেঁয়াজ-রসুনের ফোড়নের গন্ধ।

যেন সবকিছু একেবারেই স্বাভাবিক।

রিফাত ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

সকালের বাতাসে গভীর শ্বাস নিল।

মা পিছন ফিরে বললেন,

— "ঘুম কেমন হয়েছে?"

— "ভালো।"

মা তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

— "আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস।"

রিফাত হেসে উত্তর দিল,

— "আবার ডালের জন্য?"

শাহানা হেসে ফেললেন।

— "তুই না থাকলে কার জন্য রান্না করি বল?"

মুনা দৌড়ে এসে ভাইয়ের হাত ধরল।

— "চকলেট আনতে ভুলবি না কিন্তু।"

রিফাত তার নাক টিপে দিল।

— "আজ আর ভুলব না।"

রিমি বই হাতে বসে ছিল।

আজ বিকেলে তার নতুন একজন ছাত্রকে পড়াতে যাওয়ার কথা।

নীলা পরীক্ষার নোট গুছিয়ে রাখছিল।

সে বলল,

— "ভাইয়া, আজ ফিরলে একটু ইংরেজিটা দেখে দিস।"

— "ঠিক আছে।"

এই ছোট ছোট কথাগুলো ছিল তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ।

কেউ বুঝতে পারেনি, এই কথাগুলোই শেষ কথা হয়ে থাকবে।

খাওয়া শেষে রিফাত ব্যাগটা কাঁধে তুলল।

দরজার সামনে এসে মা আবার ডাকলেন।

— "শোন।"

— "জি?"

— "রাস্তা দেখে চলিস।"

— "আচ্ছা।"

— "আর ফোনটা কাছে রাখিস।"

রিফাত মুচকি হেসে বলল,

— "ঠিক আছে মা।"

শাহানা দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছেলেকে চলে যেতে দেখলেন।

যতক্ষণ চোখে দেখা যায়।

তারপর ধীরে দরজা ভেড়িয়ে দিলেন।

তিনি জানতেন না—

এই দরজা আর কোনোদিন আগের মতো খুলবে না।

দোকানে পৌঁছে রিফাত কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।

মালিক রহমান সাহেব নতুন মাল গুনছিলেন।

গ্রাহক আসছিল।

হিসাব লিখতে লিখতে সময় এগিয়ে যাচ্ছিল।

এর মাঝেই একবার তার মনে পড়ল রাতের সেই টোকা।

সে ভাবল, রাতে মাকে জিজ্ঞেস করবে।

আসলে কী হয়েছিল?

কিন্তু তারপর কাজের ব্যস্ততায় বিষয়টা ভুলে গেল।

এদিকে বাড়িতে দিন শুরু হয়েছে স্বাভাবিক ছন্দে।

শাহানা বাসন ধুয়ে সেলাই মেশিনের সামনে বসলেন।

রিমি টিউশনের খাতা সাজাচ্ছিল।

নীলা বই খুলে পড়ছিল।

মুনা রঙ পেন্সিল দিয়ে নতুন একটা ছবি আঁকছিল।

ছবিতে একটি ছোট বাড়ি।

বাড়ির সামনে পাঁচজন মানুষ।

সে ছবির ওপরে লিখল—

"আমাদের পরিবার"

শাহানা ছবিটা দেখে মৃদু হেসে বললেন,

— "খুব সুন্দর হয়েছে।"

মুনা বলল,

— "ভাইয়া এলে দেখাব।"

দুপুরের রোদ একটু একটু করে উঠোনে নেমে আসছিল।

পাখির ডাক কমে গেছে।

গলির ভেতর মানুষজন যে যার কাজে ব্যস্ত।

দূরে সবজি বিক্রেতার হাঁক।

একটি রিকশার ঘণ্টা।

সবকিছুই যেন একেবারে সাধারণ।

কিন্তু কখনও কখনও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনাও সবচেয়ে সাধারণ দিনের ভেতরেই এসে দাঁড়ায়।

পাশের বাড়ির রবিন তার মোটরসাইকেল পরিষ্কার করছিল।

হঠাৎ তার চোখ পড়ল রিফাতদের বাড়ির দিকে।

দরজাটা আধখোলা।

এতে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না।

শাহানা প্রায়ই দরজা খোলা রাখতেন।

তিনি আবার নিজের কাজে মন দিলেন।

কিছুক্ষণ পর গলির ভেতর অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এল।

যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেছে।

তারপর—

একজন নারীর আতঙ্কিত চিৎকার।

"কেউ আছেন?"

আরেকটি কণ্ঠ।

"দ্রুত আসুন!"

রবিন ছুটে গেল।

পাশের বাড়ির লোকজনও দৌড়ে এল।

কেউ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্থির হয়ে গেল।

কেউ মুখে হাত চাপা দিল।

কেউ মোবাইল বের করে জরুরি নম্বরে ফোন করল।

গলির ভেতর মুহূর্তেই মানুষ জমে গেল।

কেউ কিছু স্পষ্ট বলতে পারছিল না।

শুধু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছিল।

কয়েক মিনিটের মধ্যে খবর পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল।

মানুষ দৌড়ে আসতে লাগল।

কারও মুখে অবিশ্বাস।

কারও চোখে জল।

একজন বৃদ্ধ বিড়বিড় করে বলছিলেন,

— "এমন তো হওয়ার কথা না..."

আরেকজন বললেন,

— "সকালে তো সবাইকে দেখলাম..."

শব্দগুলো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

কেউই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।

দূর থেকে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

একটি গাড়ি এসে থামল।

পুলিশ দ্রুত চারপাশ ঘিরে ফেলল।

কৌতূহলী মানুষকে দূরে সরে যেতে বলা হলো।

একজন কর্মকর্তা প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন।

কখন কে কী দেখেছে।

কোন সময় কে এসেছিল।

কে বেরিয়েছিল।

প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর যেন আরও গভীর নীরবতা তৈরি করছিল।

দোকানে তখনও কিছুই জানে না রিফাত।

সে এক গ্রাহকের জন্য মালপত্র গুছিয়ে দিচ্ছে।

তার মোবাইল কাউন্টারের ওপর রাখা।

একবার স্ক্রিন জ্বলে উঠল।

অপরিচিত নম্বর।

কাজের চাপে সে ধরল না।

কিছুক্ষণ পর আবার।

তারপর আবার।

অস্থিরতা যেন ধীরে ধীরে তার অজান্তেই কাছে এগিয়ে আসছিল।

এদিকে এলাকায় ফিসফাস শুরু হয়েছে।

কেউ বলছে, সকালে একজন অপরিচিত মানুষকে আশেপাশে দেখা গেছে।

কেউ বলছে, কয়েকদিন ধরেই সে ঘোরাফেরা করছিল।

রবিনের মনে পড়ল—

শাহানা আপা তো বলেছিলেন, একজন লোক তাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে।

তখন তিনি বিষয়টা গুরুত্ব দেননি।

হঠাৎ বুকের ভেতর অপরাধবোধ জমে উঠল।

যদি সেদিন কথাটা গুরুত্ব দিয়ে খোঁজ নিতেন?

যদি এলাকাবাসী একটু সতর্ক হতো?

কিন্তু এখন "যদি" শব্দটির আর কোনো মূল্য নেই।

পুলিশ আশপাশের মানুষকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল।

একজন বললেন,

— "লোকটাকে আগে কখনও দেখিনি।"

আরেকজন বললেন,

— "কয়েকদিন ধরে এলাকায় ঘুরছিল।"

তৃতীয়জন ধীরে বললেন,

— "কাউকে খুঁজছিল মনে হয়।"

একজন পুলিশ কর্মকর্তা নোটবই বন্ধ করলেন।

তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

মনে হলো, বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলো ধীরে ধীরে একটি ছবিতে রূপ নিচ্ছে।

ঠিক তখনই আরেকজন পুলিশ সদস্য দ্রুত এগিয়ে এলেন।

তিনি খুব নিচু স্বরে কিছু বললেন।

কর্মকর্তা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।

তারপর আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— "আমরা একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি।"

চারদিকে নিস্তব্ধতা।

সবাই অপেক্ষা করছে।

কর্মকর্তা ধীরে ধীরে সেই নামটি উচ্চারণ করলেন।

একটি নাম—

যে নামটি শুনে কয়েকজন প্রতিবেশী বিস্ময়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল।

কারণ সেই মানুষটিকেই তারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এলাকায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখেছিল।

আর সেই মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করল—যে অচেনা ছায়াকে এতদিন সবাই উপেক্ষা করেছিল, সেই ছায়ারই এখন একটি পরিচয় আছে।

কিন্তু সেই পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল আরও অনেক প্রশ্ন—কেন এই পরিবার? কী উদ্দেশ্যে? আর কীভাবে একটি সাধারণ সকালের আলো এত দ্রুত অসহনীয় অন্ধকারে ডুবে গেল?

প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে শুরু হবে তদন্ত, আর রিফাতকে মুখোমুখি হতে হবে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার।

চলবে........