ঢাকা, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬,
সময়: ০৪:১২:৩৩ PM

জাপানি মামুনের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
20-06-2026 02:44:18 PM
জাপানি মামুনের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের কারসাজি, প্রতারণা ও সিন্ডিকেট কার্যক্রমের অভিযোগ উঠে আসছে। সম্প্রতি এমনই একটি আলোচিত অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘জাপানি মামুন’ নামে পরিচিত মিয়া মামুন। অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে ভুয়া পরিচয়পত্র, একাধিক টিআইএন নম্বর, ভিন্ন নামে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, জাল নথি ব্যবহার এবং শেয়ারবাজারে কারসাজির মাধ্যমে বিপুল আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে এটি দেশের আর্থিক খাত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

মিয়া মামুন, মামুন মিয়া এবং মো. মামুন মিয়া—এই তিন নামে একই ব্যক্তি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি নথিপত্র ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনি একই পরিচয়ের বিপরীতে একাধিক নামে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) এবং ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করেছেন। এসব নথি ব্যবহার করে তিনি নিজেকে কখনো বাংলাদেশি নাগরিক, আবার কখনো জাপানি বিনিয়োগকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

মিয়া মামুন বর্তমানে মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। একই সঙ্গে তিনি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান এমারল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের উল্লেখযোগ্য শেয়ারধারী হিসেবেও পরিচিত। অতীতেও তার বিরুদ্ধে কাগজসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান গঠন, ভুয়া বিনিয়োগ প্রদর্শন, জাল নথি ব্যবহার এবং কাগুজে ঋণের মাধ্যমে সম্পদ দেখিয়ে শেয়ারবাজারে সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি প্রতারণার অভিযোগে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছিল।

২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে নিবন্ধন লাভ করে। কোম্পানি নিবন্ধনের আগে মো. মামুন মিয়া নামে তিনি করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত হন এবং একটি টিআইএন নম্বর গ্রহণ করেন। ওই টিআইএন সনদে তার নাম ছিল ‘মো. মামুন মিয়া’ এবং সেই নামেই কোম্পানির নথিপত্রে তিনি নিবন্ধিত হন।

তবে পরবর্তী সময়ে তার পরিচয়ে নানা পরিবর্তন দেখা যায়। ২০১৯ সাল থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক নথিতে তিনি নিজেকে জাপানি বিনিয়োগকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। ২০২১ সালে এমারল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ২০২২ সালে ফু-ওয়াং ফুডস লিমিটেড অধিগ্রহণসংক্রান্ত নথিতে তিনি জাপানি ভাষায় স্বাক্ষর করেন এবং ‘মিয়া মামুন’ নামে পরিচয় দেন। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে মিনোরি বাংলাদেশকে একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে তার মূল টিআইএন সনদে নাম পরিবর্তন করে ‘মামুন মিয়া’ করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশি ঠিকানার পরিবর্তে একটি জাপানি ঠিকানা যুক্ত করা হয়। অথচ আইন অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টে সংশোধন ছাড়া টিআইএন সনদে নাম পরিবর্তন করা যায় না। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, ওই সময় তার পাসপোর্ট এবং জাতীয় পরিচয়পত্রে আগের নামই বহাল ছিল।

এর কিছুদিন পর তিনি আরেকটি টিআইএন নম্বর গ্রহণ করেন। সেখানে আবার ‘মো. মামুন মিয়া’ নাম ব্যবহার করা হয় এবং গুলশানের একটি ভাড়া অফিসকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়। পরবর্তীতে একই টিআইএন নম্বরের বিপরীতে ভিন্ন নামে আরও একটি সনদ তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে দুটি টিআইএন নম্বরের বিপরীতে অন্তত তিনটি আলাদা টিআইএন সনদের অস্তিত্বের তথ্য সামনে এসেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিধান অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি একাধিক টিআইএন নম্বর ব্যবহার করতে পারেন না। আয়ের তথ্য গোপন করা, সম্পদের উৎস আড়াল করা বা অবৈধ আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে কেউ একাধিক টিআইএন ব্যবহার করলে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সচেতনভাবে একাধিক টিআইএন ব্যবহার করার পেছনে সাধারণত অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করে।

শুধু টিআইএন নয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েও গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালে একটি এনআইডি কার্ডে ‘মো. মামুন মিয়া’ নাম ব্যবহার করা হলেও পরবর্তীতে একই এনআইডি নম্বরে নাম পরিবর্তন করে ‘মামুন মিয়া’ করা হয়। এরপর একই নম্বর ব্যবহার করে ‘মিয়া মামুন’ নামে আরেকটি সংস্করণও তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একজন নাগরিকের একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার সুযোগ নেই এবং এ ধরনের জালিয়াতি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ব্যাংকিং খাতেও তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভিন্ন ভিন্ন নামে অন্তত চারটি ব্যাংকে ছয়টি হিসাব পরিচালনা করেছেন তিনি। এসব হিসাব খোলার সময় বিভিন্ন নামে এনআইডি ও টিআইএন সনদ জমা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ব্যক্তি একাধিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করলে অর্থপাচার, কর ফাঁকি এবং অবৈধ লেনদেনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

মিয়া মামুন ২০১৮ সালে বৈবাহিক সূত্রে একটি জাপানি পাসপোর্ট লাভ করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী ভিসাও গ্রহণ করেন। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জাপানি পাসপোর্ট পাওয়ার আগেই তিনি নিজেকে জাপানি বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। জাপানের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি নাগরিকত্ব বেছে নিতে হয়। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশি ও জাপানি পরিচয় ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আইনি জটিলতাও তার পিছু ছাড়েনি। ২০২৪ সালে একটি চেক জালিয়াতি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক মাসের বেশি সময় কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, জমি সংক্রান্ত জালিয়াতি, প্রতারণা এবং একাধিক চেক জালিয়াতির মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৫ সালে একটি তদন্তে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ উত্থাপন করে। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি এমারল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শেয়ারদরে অস্বাভাবিক উত্থান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই কয়েক দিনের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কারসাজির ইঙ্গিত বহন করতে পারে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মিনোরি বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে ‘জাপানি প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। অথচ কোম্পানিটি নিবন্ধনের সময় এর উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন এবং বাংলাদেশি নথিপত্র ব্যবহার করেই কোম্পানি গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নথিতে জাপানি পরিচয় ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিকে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, মিনোরি বাংলাদেশ এমারল্ড অয়েলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি বিনিয়োগ দেখিয়েছে। বিভিন্ন আর্থিক বিবরণীতে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ, শেয়ার মানি ডিপোজিট এবং ঋণ প্রদর্শন করা হলেও তার পক্ষে পর্যাপ্ত ব্যাংক লেনদেন বা আইনসম্মত নথিপত্র পাওয়া যায়নি। এমনকি কিছু ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অডিট প্রতিবেদনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার তথ্য দেখানো হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট সময়কালে কিছু প্রতিষ্ঠানেরই অস্তিত্ব ছিল না। আবার কিছু ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিনোরির পরিচালকদের সরাসরি সম্পর্ক থাকলেও তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের তথ্য গোপন করা করপোরেট সুশাসনের পরিপন্থী।

বাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র ১০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করা মিনোরি বাংলাদেশ খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে একটি বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়। অথচ প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও আর্থিক সক্ষমতা সেই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

সব মিলিয়ে মিয়া মামুন ও মিনোরি বাংলাদেশকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, তা দেশের পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ভুয়া পরিচয়, একাধিক টিআইএন, ব্যাংক হিসাব, জাল নথি, কাগুজে বিনিয়োগ এবং শেয়ারবাজারে কারসাজির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।