ঢাকা, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
সময়: ০১:৪১:১৫ PM

৪৭–২৬:ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
13-06-2026 06:00:00 AM
৪৭–২৬:ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং বৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার দেশগুলোর একটি। দেশটির সংবিধান সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করলেও বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, বৈষম্য এবং ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে মুসলিম সম্প্রদায়কে এসব ঘটনার অন্যতম ভুক্তভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম সম্প্রদায় ও তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার খবর প্রচারিত হয়। সমালোচকদের দাবি, এসব ঘটনার অনেকগুলো মূলধারার গণমাধ্যমে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছু এলাকায় মুসলিমদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ নিয়েও আলোচনা দেখা গেছে। তবে এসব ঘটনার প্রকৃত তথ্য ও পরিস্থিতি যাচাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবাধিকার রক্ষা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা উভয় দেশের জনগণের স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশভাগ ও প্রাথমিক সহিংসতা (১৯৪৭–১৯৫০)

ভারত ভাগ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ মানবিক বিপর্যয়। ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির সময় ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটে। ইতিহাসবিদদের অনুমান অনুযায়ী কয়েক লাখ থেকে প্রায় ২০ লাখ মানুষ নিহত হয় এবং কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। নিহতদের মধ্যে হিন্দু, মুসলিম ও শিখ—সব সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। ভারতে ও পাকিস্তানে উভয় দিকেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সহিংসতার শিকার হন।

১৯৬০–১৯৮০-এর দশকের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন শহরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • ১৯৬৯ আহমেদাবাদ রায়ট 
  •  ১৯৭০ সালের ভিওয়ান্ডি রায়ট
    
    
    ১৯৭৯ জামশেদপুর দাঙ্গা
    ১৯৮০ মোরাদাবাদ দাঙ্গা
    নেলি হত্যাকাণ্ড
     
    
    
  • এসব ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম জনগোষ্ঠী তুলনামূলক বেশি প্রাণহানি ও সম্পত্তি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট, দায় ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বাবরি মসজিদ ও পরবর্তী সহিংসতা

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা ভারতের সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর পর দেশজুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষ করে:

  •  ১৯৯২-৯৩ বোম্বে রায়ট 
  • বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ

সরকারি হিসাব অনুযায়ী এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলিম ছিলেন। পরবর্তী তদন্ত কমিশনগুলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয়ও তুলে ধরে।

গুজরাট ২০০২

2002 গুজরাট রায়ট স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের সবচেয়ে আলোচিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলোর একটি।

Gujarat-এ সংঘটিত এই দাঙ্গায় সরকারি হিসাব অনুযায়ী এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের অধিকাংশ মুসলিম। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষক নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে দাবি করেছেন। হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন এবং বহু মসজিদ, দোকান ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ধর্মীয় স্থাপনার ওপর হামলা

১৯৪৭–২০২৬ সময়কালে বিভিন্ন সময়ে মসজিদ, দরগাহ, কবরস্থান ও অন্যান্য ইসলামি ধর্মীয় স্থাপনার ওপর হামলা, ভাঙচুর বা দখল নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • বাবরি মসজিদ ধ্বংস (১৯৯২)
  • বিভিন্ন দাঙ্গার সময় স্থানীয় মসজিদে হামলা
  • কবরস্থান ও ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ
  • কিছু অঞ্চলে ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ বা অবৈধ দখল নিয়ে আদালত ও প্রশাসনিক বিরোধ

তবে ধর্মীয় স্থাপনা ক্ষতির একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান বর্তমানে উপলব্ধ নয়।

২০১০-এর দশক ও গণপিটুনির ঘটনা

২০১০-এর দশকে গরু পরিবহন, গরু জবাইয়ের অভিযোগ বা ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে কয়েকটি বহুল আলোচিত গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশে মুসলিমরা ভুক্তভোগী ছিলেন।

উল্লেখযোগ্য আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • মোহাম্মদ আখলাক হত্যাকাণ্ড (২০১৫)
  • পিলু খান হত্যাকাণ্ড (২০১৭)
  • অন্যান্য গণপিটুনি ও ঘৃণাপ্রসূত সহিংসতার ঘটনা

এসব ঘটনা ভারত ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে।

দিল্লি ২০২০

২০২০ দিল্লি রায়ট -এ ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

বিভিন্ন তদন্ত, সংবাদ প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার সংস্থার মূল্যায়নে দেখা যায় যে নিহতদের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা বেশি ছিল এবং মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় উল্লেখযোগ্য সম্পত্তি ক্ষতি হয়। যদিও ঘটনার ব্যাখ্যা ও দায় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

বৈষম্য ও সামাজিক উদ্বেগ

বিভিন্ন গবেষণা, মানবাধিকার সংস্থা এবং একাডেমিক প্রতিবেদনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কিছু উদ্বেগের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে:

  • আবাসন ও কর্মসংস্থানে বৈষম্যের অভিযোগ
  • সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য
  • ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সহিংসতা
  • নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদ্বেগ

অন্যদিকে ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠী শিক্ষা, ব্যবসা, রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানও রেখে চলেছে।

১৯৪৭ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ভারতের ইতিহাসে মুসলিম সম্প্রদায় একাধিক দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, গণপিটুনি এবং ধর্মীয় স্থাপনার ওপর হামলার ঘটনার শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে এবং বহু ক্ষেত্রে আদালত, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ এসব ঘটনার বিচার ও প্রতিকার চেয়েছে।

এই ইতিহাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রচারণা বা অতিরঞ্জনের পরিবর্তে যাচাইযোগ্য তথ্য, গবেষণা, সরকারি নথি এবং মানবাধিকার প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সঠিক তথ্যই অতীত বোঝা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধের ভিত্তি তৈরি করে।