ঢাকা, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:১৫:০৮ AM

অভিমান ভেঙে ঐক্যের পথে বিএনপি?

মান্নান মারুফ
11-06-2026 11:01:08 AM
অভিমান ভেঙে ঐক্যের পথে বিএনপি?

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। এই সময়ে দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মী মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, হামলা-মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেক নেতাকে বছরের পর বছর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছে, কেউ আত্মগোপনে থেকেছেন, কেউ কারাগারে কাটিয়েছেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। আদালত, কোর্ট-কাচারি আর রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যেই কেটেছে তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন।

এমন বাস্তবতায় বিএনপির অনেক নেতাকর্মী নিজেদেরকে দলের পরীক্ষিত সৈনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তবে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে বিএনপি কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করা, শৃঙ্খলাভঙ্গ কিংবা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ার অভিযোগে বহু নেতাকে বহিষ্কার কিংবা সাময়িকভাবে দলীয় কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় অন্তত ১৯০ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে তাদের একটি বড় অংশ পুনরায় বিএনপিতে ফিরতে আগ্রহী। শুধু আগ্রহীই নন, অনেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে দলের হাইকমান্ডের কাছে আবেদনও জমা দিয়েছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত বিএনপি প্রায় সাড়ে চার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এর মধ্যে দুই হাজার ৬০০-এর বেশি নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

যদিও নির্বাচনের আগে বহিষ্কৃতদের একটি ক্ষুদ্র অংশকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়, তবে অধিকাংশ নেতাই এখনও দলের বাইরে অবস্থান করছেন। তাদের অনেকেই কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আন্দোলন-সংগ্রামের সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

বহিষ্কৃতদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম সাবেক মন্ত্রী ও টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের একাধিকবারের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান খান আজাদ। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি বিজয়ী হন। বহিষ্কারের পর থেকেই তিনি দলে ফেরার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।

একইভাবে ময়মনসিংহ-১ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য সালমান ওমর রুবেলও বিএনপিতে ফিরতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি নির্বাচনে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্সকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে বহিষ্কৃত হলেও বর্তমানে তিনি পুনরায় দলের ছায়াতলে ফিরতে চান।

পটুয়াখালী-৩ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য হাসান মামুনও দলে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বিএনপি চাইলে তিনি পুনরায় সক্রিয় রাজনীতিতে দলের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বলে ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে।

শুধু নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই নন, নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হওয়া বহিষ্কৃত নেতারাও দলে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। নাটোর-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গেই তিনি শেষ জীবন পর্যন্ত থাকতে চান। দল যখন প্রয়োজন মনে করবে, তখনই তিনি দলের আহ্বানে সাড়া দেবেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব যার অবদান অনেক। দলের বিপদের সময় জীবনকে উপেক্ষা করে দলের জন্য মাঠ দখলে রেখেছেন। এই নেতা দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই দলে ফেরার আশায় রয়েছেন। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে  তার বিরুদ্ধে ৪৫৭টি মামলা হয়েছে এবং একাধিকবার তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে।এত মামলার হাজিরার কারনে জীবনটা আদালত চত্বরেই পার করেছেন। বহিষ্কারের পরও তিনি বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় থেকেছেন। তার মতে, বিএনপির বাইরে তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। বিএনপির আদর্শই হচ্ছে তার শেষ আর্দশ।

ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বহিষ্কৃত হওয়া স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজও বিশ্বাস করেন, দলের জন্য দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও অবদান একদিন মূল্যায়িত হবে এবং দল তাদের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।

দলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা নেতাদের বড় অংশই গত ১৬ থেকে ১৭ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময় তারা আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্রভাগে ছিলেন। মামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং আর্থিক ক্ষতির বোঝা বহন করেও তারা দল ছাড়েননি।

এ কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বহিষ্কৃতদের সবাইকে একই দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। যারা দীর্ঘদিন দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধুমাত্র দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাদের ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকা উচিত।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালও এমন মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এক বা দুই যুগ ধরে যারা দলের জন্য অবদান রেখেছেন, তাদের ছোটখাটো ভুলত্রুটি সংশোধনযোগ্য হলে পুনরায় দলে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। তবে ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়াও জরুরি।

তবে বিষয়টি বিএনপির নীতিনির্ধারকদের জন্য সহজ নয়। কারণ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে অন্তত বিশটি আসনে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা পরাজিত হয়েছেন। পাশাপাশি ভোট বিভাজনের কারণে আরও কয়েকটি আসনে দলীয় প্রার্থীরা জয় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে দলকে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখতে হচ্ছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মনে করেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের দায়িত্বেই সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাই দলে ফিরতে হলে তাদের ভুল স্বীকার করতে হবে এবং দলীয় সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, দলের অনেক অবদানশীল নেতাকেও কখনও কখনও কঠোর সাংগঠনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। তবে এসব সিদ্ধান্ত কখনোই আনন্দের সঙ্গে নেওয়া হয়নি; বরং সাংগঠনিক প্রয়োজনেই তা করতে হয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত রাখা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতে সাংগঠনিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে জীবন কাটানো অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই অভিমান ও ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। তারা যদি দীর্ঘদিন দলীয় কর্মকাণ্ডের বাইরে থাকেন, তাহলে তা দলের জন্যও বুমেরাং হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ মাঠপর্যায়ে সংগঠন পরিচালনা, আন্দোলন গড়ে তোলা এবং কর্মীদের সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে এই নেতাদের অনেকেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তাই রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করে, অপরাধের মাত্রা, রাজনৈতিক অবদান এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বহিষ্কৃতদের বিষয়ে দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এতে যেমন দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে, তেমনি দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যেও নতুন উদ্দীপনা ও আনুগত্য সৃষ্টি হবে।

সব মিলিয়ে বিএনপির জন্য এটি শুধু শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং সংগঠনের ভবিষ্যৎ শক্তি ও ঐক্য রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এখন দেখার বিষয়, দলের হাইকমান্ড বহিষ্কৃত নেতাদের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।