অবশেষে একদিন থেমে যাবে এই চেনা কলরব। নিভে যাবে সব চোখে লেগে থাকা মায়ার উৎসব। যে দেহটাকে আগলে রেখেছি অতি সযতনে, সেটাও মিশে যাবে ধুলোর ভাঁজে, নিভৃত কোনো কোণে। যাদের হাসিতে রঙিন হতো আমার ঘরের দেয়াল, তারাও হয়তো কাঁদবে কিছুদিন, রেখে যাবে অসীম খেয়াল। তারপর ধীরে ধীরে সয়ে যাবে সব। স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে যাবে পুরোনো অ্যালবামের তামাটে পাতার মতো। আমি থাকব না, থাকবে না কোনো অভিযোগ। মিটে যাবে পৃথিবীর সব দেনা-পাওনার হিসাব। সব মায়া ছিন্ন করে যে পথে একদিন চলে যেতে হবে, সেখানে ফেরার কোনো পথ নেই; হবে না আর দেখা। পৃথিবী ঠিক যেমন ছিল, তেমনই রয়ে যাবে। শুধু আমি হারিয়ে যাব এক নিঝুম অচেনা ঘরে।
এই কথাগুলো প্রায়ই ভাবত আরমান।
বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। জীবনের বড় একটা সময় কেটে গেছে সংসার, দায়িত্ব, কর্মব্যস্ততা আর মানুষের ভিড়ে। অথচ যতই সময় গড়িয়েছে, ততই তার মনে হয়েছে—মানুষ আসলে একা। জন্মের সময় যেমন একা আসে, মৃত্যুর সময়ও তেমন একাই চলে যায়।
আরমানের ছোট্ট একটি বাড়ি ছিল গ্রামের শেষ প্রান্তে। বাড়ির পেছনে ছিল একটি পুরোনো বটগাছ। সন্ধ্যা নামলেই সে সেখানে বসে থাকত। বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ শুনত, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত আর ভাবত—এই বিশাল মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব কত ক্ষণস্থায়ী!
একদিন বিকেলে সে বটগাছের নিচে বসে ছিল। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। সোনালি আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এসে তার মুখে পড়ছিল। হঠাৎ একজন বৃদ্ধ দরবেশ এসে তার পাশে বসলেন।
বৃদ্ধের চোখে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন বহু দূরের কোনো পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন।
দরবেশ মৃদু হেসে বললেন,
—কী ভাবছো এত গভীর করে?
আরমান একটু চমকে উঠে বলল,
—মৃত্যুর কথা ভাবছি।
বৃদ্ধ শান্ত কণ্ঠে বললেন,
—মৃত্যুকে ভয় পাও?
—আগে পেতাম। এখন আর ভয় পাই না। তবে একটা প্রশ্ন আমাকে কষ্ট দেয়।
—কী প্রশ্ন?
—মানুষ এত কিছু নিয়ে বাঁচে কেন? এত সংগ্রাম, এত সম্পর্ক, এত ভালোবাসা—সবই যদি একদিন ফেলে যেতে হয়!
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বললেন,
—কারণ মানুষ পৃথিবীকে নিজের ঠিকানা ভেবে ভুল করে। অথচ পৃথিবী আসলে একটি সরাইখানা মাত্র। এখানে কেউ স্থায়ী নয়।
আরমান চুপ করে রইল।
দরবেশ আবার বললেন,
—তুমি কি কখনো নদী দেখেছ?
—হ্যাঁ।
—নদী কি কখনো নিজের জন্য পানি ধরে রাখে?
—না।
—মানুষও ঠিক তেমন। যা কিছু তার হাতে আসে, সবই কিছুদিনের জন্য। একদিন তাকে সব ফিরিয়ে দিতে হয়।
সেদিনের পর থেকে আরমানের জীবনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে শুরু করল।
সে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে লাগল, জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হলো ক্ষণস্থায়িত্ব। যাকে আমরা চিরদিনের মনে করি, সেও একদিন হারিয়ে যায়। যে সুখকে স্থায়ী ভাবি, সেটিও সময়ের স্রোতে ভেসে যায়। এমনকি দুঃখও চিরকাল থাকে না।
দিন কেটে যেতে লাগল।
এক রাতে আরমান স্বপ্ন দেখল, সে একটি বিশাল মরুভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে শুধু বালু আর বালু। দূরে একটি আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে।
সে সেই আলোর দিকে হাঁটতে শুরু করল।
যতই এগোতে লাগল, ততই তার শরীর হালকা হতে লাগল। মনে হলো, পৃথিবীর সব বোঝা তার কাঁধ থেকে নেমে যাচ্ছে।
হঠাৎ সে শুনতে পেল একটি কণ্ঠ—
“তুমি কেন এত বোঝা বহন করছো?”
আরমান চারদিকে তাকাল।
কাউকে দেখা গেল না।
কণ্ঠটি আবার বলল,
“যা তোমার নয়, তা আঁকড়ে ধরে আছো কেন?”
সে উত্তর দিল,
“আমি তো কিছুই আঁকড়ে ধরতে চাইনি। কিন্তু সবকিছুই আপন হয়ে গিয়েছিল।”
কণ্ঠটি বলল,
“এই পৃথিবীতে কিছুই তোমার নয়। তোমার শুধু যাত্রা।”
ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও কথাগুলো তার মনে গেঁথে রইল।
তারপর থেকে সে মানুষের প্রতি আরও কোমল হয়ে উঠল।
যে মানুষ একসময় সামান্য কথায় রাগ করত, সে এখন হাসিমুখে ক্ষমা করে দেয়। যে মানুষ আগে নিজের কষ্ট নিয়েই ব্যস্ত থাকত, সে এখন অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখে।
কারণ সে উপলব্ধি করেছিল, পৃথিবীতে আমাদের সময় খুবই অল্প।
একদিন গ্রামের এক তরুণ তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,
—চাচা, জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
আরমান কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—নিজেকে চিনতে শেখো।
—নিজেকে চিনব কীভাবে?
—মনের ভেতর নীরবতা তৈরি করো। যখন চারপাশের শব্দ থেমে যাবে, তখন নিজের আত্মার কণ্ঠ শুনতে পাবে।
তরুণটি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
আরমান মৃদু হেসে বলল,
—মানুষ সারা জীবন পৃথিবীকে জানতে চায়। অথচ নিজের ভেতরের পৃথিবীটাকে জানার সময় পায় না।
বছর ঘুরতে লাগল।
একদিন আরমান অসুস্থ হয়ে পড়ল।
চিকিৎসকরা বললেন, তার সময় খুব বেশি নেই।
খবরটি শুনে তার পরিবারের সবাই ভেঙে পড়ল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আরমানের মুখে ছিল গভীর প্রশান্তি।
রাতের বেলা জানালার পাশে বসে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত।
তার মনে হতো, অদৃশ্য কোনো দরজা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে।
এক রাতে সে তার সন্তানদের পাশে ডেকে বলল,
—আমার জন্য কেঁদো না।
তারা কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল,
—আপনাকে ছাড়া আমরা কীভাবে থাকব?
আরমান উত্তর দিল,
—যেভাবে পৃথিবী আমার আগে চলেছে, সেভাবেই চলবে। কেউ কারও জন্য থেমে থাকে না। এটাই সৃষ্টির নিয়ম।
তারপর সে ধীরে ধীরে বলল,
—মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অর্থ নয়, ক্ষমতা নয়, খ্যাতিও নয়। সবচেয়ে মূল্যবান হলো একটি সুন্দর হৃদয়।
সেদিন রাতেই সে আবার স্বপ্ন দেখল।
সে দেখল, একটি বিশাল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
দরজার ওপারে অপার্থিব আলো।
সেই আলোয় কোনো ভয় নেই, কোনো অন্ধকার নেই, কোনো বিচ্ছেদ নেই।
শুধু শান্তি।
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
তার মনে হলো, বহুদিনের ক্লান্ত পথিক অবশেষে নিজের ঘরে ফিরছে।
পরদিন ভোরে পাখিরা যখন ডাকছিল, তখন আরমানের নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে থেমে গেল।
মুখে ছিল মৃদু হাসি।
মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনো গভীর প্রশান্তির মধ্যে ঘুমিয়ে আছে।
গ্রামের মানুষজন ভিড় করল।
স্বজনেরা কাঁদল।
বন্ধুরা স্মৃতিচারণ করল।
কেউ বলল, মানুষটি খুব ভালো ছিল।
কেউ বলল, সে ছিল জ্ঞানী।
কেউ বলল, সে ছিল উদার।
কিন্তু সময় তার নিজস্ব নিয়মে চলতে থাকল।
দিন গেল।
মাস গেল।
বছরও কেটে গেল।
একসময় কান্না থেমে গেল।
স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো।
নতুন মানুষ এল, নতুন গল্প তৈরি হলো।
পুরোনো অ্যালবামের এক কোণে আরমানের ছবি রয়ে গেল।
ধুলোর স্তর জমল তার ওপর।
তবু কোথাও যেন তার অস্তিত্ব হারিয়ে গেল না।
কারণ সে বুঝেছিল, মানুষ দেহ নয়; মানুষ একটি যাত্রা। আত্মা এক অদৃশ্য পথিক, যে কিছুদিনের জন্য পৃথিবীর সরাইখানায় আশ্রয় নেয়, তারপর আবার ফিরে যায় তার প্রকৃত গন্তব্যের দিকে।
পৃথিবীর কোলাহল, হাসি-কান্না, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি—সবই সময়ের নদীতে ভেসে যায়। কিন্তু যে হৃদয় সত্যকে স্পর্শ করে, যে আত্মা স্রষ্টার দিকে ফিরে যেতে শেখে, তার মৃত্যু হয় না।
সে শুধু এক জগত থেকে আরেক জগতে পাড়ি জমায়।
আর পৃথিবী?
পৃথিবী ঠিক আগের মতোই থাকে।
সূর্য ওঠে, সন্ধ্যা নামে, শিশুরা খেলে, পাখিরা গান গায়, মানুষ ভালোবাসে, মানুষ বিচ্ছেদে কাঁদে।
সবকিছু চলতে থাকে আপন গতিতে।
শুধু কোনো এক নীরব রাতে, বাতাস যখন পুরোনো বটগাছের পাতায় সুর তোলে, তখন যেন অদৃশ্য কোথাও থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে আসে—
“অবশেষে একদিন থেমে যাবে এই চেনা কলরব। নিভে যাবে সব চোখে লেগে থাকা মায়ার উৎসব। পৃথিবী রয়ে যাবে, কিন্তু মানুষ ফিরে যাবে তার চিরন্তন ঠিকানায়। কারণ এই পৃথিবী বাসস্থান নয়; এটি কেবল পথ। আর পথের শেষে অপেক্ষা করে এক নিঝুম, শান্ত, আলোকময় ঘর।” সমাপ্ত।