ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০২:০৪:১৫ AM

শিক্ষা প্রকৌশলীর বিরামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
22-07-2026 12:48:59 PM
শিক্ষা প্রকৌশলীর বিরামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি

বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের প্রভাব নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র, ঠিকাদার ও দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য এবং প্রভাবশালী ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ বণ্টনের কারণে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই বা সরকারি তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘নির্বাচিত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের উন্নয়ন (আসবাবপত্র)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বরিশাল অঞ্চলের ৬০টি কাজের মধ্যে ২৯টি কাজের একটি বড় অংশ একই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মেসার্স মা কনস্ট্রাকশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান ২১টি কার্যাদেশ পেলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি।

এসব প্রকল্পের মধ্যে আগৈলঝাড়া উপজেলার রামানন্দের আঁক মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাকাল নিরঞ্জন বৈরাগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রত্নপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, টরকি বন্দর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, গৌরনদী উপজেলার পালরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পিঙ্গলাকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বানারীপাড়া উপজেলার পশ্চিম ইলুহার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উজিরপুর উপজেলার কুড়ালিয়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মুলাদী উপজেলার বানীমদ্দন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সফিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চরপদ্মা আফসারিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার গৌরীপুর কাদিরাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চানপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বরিশাল সদর উপজেলার হিজলতলা মৌলভীরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বুখাইনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাকেরগঞ্জ উপজেলার ছোট রঘুনাথপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম নলুয়া রাবেয়া বেগম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দুধলমৌ এ. কিউ. এম. মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মধ্যম মহেষপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং নলুয়া আবুল কাশেম মোল্লা মাধ্যমিক বিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য।

অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিল পরিশোধ ও জামানতের চেক ছাড়ের ক্ষেত্রে কমিশন গ্রহণ করেন। কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, প্রকল্পভেদে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট প্রকল্পের কাজ নিয়ে পরে তা বেশি দামে অন্য ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা জানান, বরিশাল কার্যালয়ে ৭ থেকে ৮ জনের একটি ঠিকাদার সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। তাদের প্রভাবের কারণে সাধারণ ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাজ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের মান ও বাস্তবায়নের গতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তাদের দাবি।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আশিকুর রহমান বিভিন্ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখছেন। সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, তাদের দুজনের সমন্বয়ে কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী আশিকুর রহমান।

এদিকে অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বরিশালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাহী প্রকৌশলী নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক বজায় রেখে বিভিন্ন অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিভিন্ন ধরনের আলোচনা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, “শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

তবে অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধান প্রকৌশলীর এমন আশ্বাস দেওয়ার পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আগের মতোই বহাল রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।

অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হলে একদিকে যেমন দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহি ও সুশাসনও নিশ্চিত হবে।