পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ও তার স্ত্রী শাহান আরার নামে রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে ১৪টি ফ্ল্যাটসহ অর্ধশত কোটি টাকার সম্পত্তি। এ ছাড়া নিজের জেলা টাঙ্গাইল এবং শ্বশুরবাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জেও বিপুল সম্পত্তি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে পাসপোর্ট দেওয়াসহ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
কে এই আব্দুল্লাহ আল মামুন
২০০৪ সালের মে মাসে সহকারী পরিচালক হিসেবে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে যোগ দেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। কর্মজীবনের শুরুতে কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন বলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছত্রচ্ছায়ায় মামুনের প্রভাব বাড়ে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালে পরিচালক পদে পদোন্নতি পান তিনি। ওই বছরের জুনে রাজধানীর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের পরিচালকের দায়িত্ব নেন। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত ওই পদে থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুদিন সন্ধ্যার পর মামুন ধানমন্ডি ৫ নম্বরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে যেতেন। ৫ আগস্টের পর তাকে সিলেটে বদলি করা হয়। সেখানে বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক থাকাকালে ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই দিনে তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক।
ঢাকায় ১৪ ফ্ল্যাট
অনুসন্ধানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মামুনের নিজের নামে অন্তত ১০টি এবং স্ত্রী শাহান আরার নামে আরও চারটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে। ধানমন্ডি, এলিফেন্ট রোড, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, কাটাসুর, বসুন্ধরা ও জোয়ার সাহারা এলাকায় এসব সম্পত্তি রয়েছে।
২০০৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাফকবলা দলিলের মাধ্যমে এসব ফ্ল্যাট কেনা হয়। অনুসন্ধানে পাওয়া নয়টি দলিলে মামুনের নামে ১০ হাজার ৭৯১ বর্গফুটের বেশি আয়তনের ফ্ল্যাটের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে।
ধানমন্ডি ১১/এ রোডের ৭৭ নম্বর বাড়িতে ২ হাজার ২৫১ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার নামে। একই এলাকায় নর্থ রোডের ৫০ নম্বর বাড়িতে ৯৮০ বর্গফুট এবং নিউ এলিফেন্ট রোডের ২২০ নম্বর হোল্ডিংয়ে ১ হাজার বর্গফুটের আরও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এ তিনটির মূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা।
হাজারীবাগের চরমোহনপুরে ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাটের মালিক মামুন। এগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। মোহাম্মদপুরের কাটাসুরে ১ হাজার ১০০ বর্গফুটের দুটি এবং চাঁদ হাউজিংয়ে ৭৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। এ তিনটির মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।
এ ছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এফ ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ‘হলি অর্ণব’ ভবনে তার নামে রয়েছে একটি ফ্ল্যাট, যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি টাকা। ইবরাহিমপুরে যৌথ মালিকানায় ২০ কাঠা জমিও কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে ১৮ জন মিলে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন।
স্ত্রীর নামেও বিপুল সম্পত্তি
মামুনের স্ত্রী শাহান আরার নামেও ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, কাটাসুর ও জোয়ার সাহারা এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। ধানমন্ডি ৪ নম্বর রোডে তার নামে প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।
কাটাসুরে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট এবং মোহাম্মদপুর মৌজায় দেড় কোটি টাকার বেশি মূল্যের আরেকটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া জোয়ার সাহারা এলাকায় প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার নামে।
অনুসন্ধানে পাওয়া দলিল ও নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মামুন নিজের নামে যেসব এলাকায় সম্পত্তি কিনেছেন, অনেক ক্ষেত্রে একই সময়ে ওইসব এলাকায় স্ত্রীর নামেও সম্পত্তি কেনা হয়েছে।
ব্যাংকে ১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা
অনুসন্ধানে চারটি ব্যাংকে মামুনের পাঁচটি হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। চলতি বছরের ১৫ জুন পর্যন্ত এসব হিসাবের লেনদেনের স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকের দুটি হিসাবে রয়েছে যথাক্রমে ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৪৩৪ টাকা এবং ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬১ হাজার ৮৬ টাকা।
এ ছাড়া ট্রাস্ট ব্যাংকে ২০ লাখ ৭০ হাজার ৩০৩ টাকা, সোনালী ব্যাংকে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৭ টাকা এবং জনতা ব্যাংকে ২ হাজার ৬৬৩ টাকা রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব হিসাবে মামুনের জমা অর্থের পরিমাণ ১৭ কোটি ৮৮ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫৩ টাকা।
একাধিক সূত্রের দাবি, আত্মীয়স্বজনের নামে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে মামুনের আরও বিপুল পরিমাণ এফডিআর রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
বক্তব্য দেয়নি কর্তৃপক্ষ, মন্তব্য করেননি মামুন
মামুনের সম্পদের পরিমাণ তার সরকারি বেতন-ভাতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি সাময়িক বরখাস্ত থাকায় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে পদে ফিরতে মামুন জোর তদবির চালাচ্ছেন।
বিপুল সম্পদ অর্জনের বিষয়ে জানতে আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ২০ বছরের চাকরিজীবনে কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকারও করেননি।