ঢাকা, শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:১২:০৯ AM

চুক্তির আড়ালে টেশিসে শতকোটি অর্থ লুট

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
28-08-2026 10:09:47 PM
চুক্তির আড়ালে টেশিসে শতকোটি অর্থ লুট

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থা লিমিটেড (টেশিস)-এর মিটার প্ল্যান্টে গত দেড় দশক ধরে চলছে নজিরবিহীন অনিয়ম ও চরম আর্থিক দুর্নীতি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘একটিভ ডিজিটাল মিটার ও ইন্সট্রুমেন্ট লিমিটেড’ (ADMI)-এর সাথে টেশিসের সম্পাদিত একটি স্বার্থবিরোধী চুক্তিকে ঢাল বানিয়ে এই লুটপাট চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চুক্তির আড়ালে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ওভারইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে।
এমনকি গত মার্চ মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করার পরও রহস্যজনক কারণে এখনো কোনো দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

### স্বার্থবিরোধী চুক্তি ও শতকোটি টাকার কার্যাদেশ

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি  টেশিস এবং ADMI-এর মধ্যে একটি যৌথ কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে প্রথম দফায় ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় দফায় সময় বাড়িয়ে চুক্তিটির মেয়াদ ২০৩০ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে।
বিগত ১৫ বছরে (১ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত) টেশিস মিটার প্ল্যান্ট ডেসকো, ডিপিডিসি এবং এনপিবিএস-১-এর মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রিপেইড এনার্জি মিটার সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য মোট “৬২১ কোটি ৬৯ লাখ ৮৬,১৬১ টাকার” কার্যাদেশ পেয়েছে। কিন্তু এই বিপুল অঙ্কের লেনদেন ও বিশাল কর্মযজ্ঞ সত্ত্বেও টেশিস লাভবান হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছে।

### ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে ৪% মুনাফা, ব্যাংকের ক্ষতি শতকোটি

চুক্তির ধারা অনুযায়ী, মিটার প্ল্যান্টের এলসি (লেটার অফ ক্রেডিট) এবং এলসির মার্জিনের সমস্ত টাকা টেশিস তার ব্যাংকে জমানো ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) থেকে পরিশোধ করত। বিনিময়ে ADMI টেশিসকে মাত্র ৪% মুনাফা দিত।
যেখানে গত ১৫ বছর ধরে ব্যাংকে এফডিআর-এর সুদের হার ছিল ১০% থেকে ১২%, সেখানে রাষ্ট্রীয় টাকা বিনিয়োগ করে মাত্র ৪% মুনাফা নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে পরিকল্পিতভাবে একটি রুগ্ন ও অলাভজনক সংস্থায় পরিণত করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের শতকোটি টাকারও বেশি লোকসান হয়েছে।

### টেশিসের পিঠে চড়ে ADMI-এর একচ্ছত্র রাজত্ব

চুক্তির ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, টেশিসকে চুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ অন্ধ ও পঙ্গু করে রাখা হয়েছে:
   •  একক আর্থিক ক্ষমতা: মাত্র ৩৫% বিনিয়োগের অংশীদার হয়েও ADMI-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্ল্যান্টের সমস্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা একচেটিয়া ভোগ করছেন।
   •  মূল্য নির্ধারণে জালিয়াতি: সিইও একাই মালামাল আমদানি ও বিক্রির মূল্য নির্ধারণ করেন। ফলে প্রকৃত ক্রয় ও বিক্রয় মূল্য কত, তা টেশিস কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ অন্ধকারে। অথচ এলসির কোটি কোটি টাকা পরিশোধ করছে টেশিস।
     •  নামেমাত্র প্রযুক্তি হস্তান্তর: চুক্তিতে ইলেকট্রিক মিটার অ্যাসেম্বলি/ম্যানুফ্যাকচারিং এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের কথা থাকলেও, ADMI সরাসরি চীন থেকে তৈরি মিটার এনে সরবরাহ করছে। প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হয়নি।
      •  ভাড়া ও সুযোগ-সুবিধা ফাঁকি: টেশিসের ৫,০০০ বর্গফুটের বেশি জায়গা ও স্টোর রুম ব্যবহার করলেও গত ১৫ বছরে কোনো ভাড়া দেয়নি ADMI। বর্তমানে বকেয়া ভাড়ার পরিমাণই প্রায় ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা।

### কর্মকর্তাদের দায় স্বীকার ও অর্থ পাচারের সংশয়

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের দুর্নীতি বিরোধী টাস্কফোর্সের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে টেশিসের মিটার প্ল্যান্টের কো-অর্ডিনেটর ও হিসাব শাখার কর্মকর্তারা লিখিতভাবে স্বীকার করেছেন যে, এই চুক্তিটি টেশিসের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, টেশিসের মূল অর্থ ও হিসাব শাখার কাছে এই মিটার প্ল্যান্টের লেনদেনের কোনো তথ্যই সংরক্ষিত নেই।
অভিযোগ রয়েছে, চীনা প্রতিষ্ঠান ‘কাইফা মিটারিং টেকনোলজি’ থেকে মিটার আমদানির নামে ADMI-এর মালিক সৈয়দ মুনিরুজ্জামান ওভারইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার করেছেন। ইতোমধ্যে এই মুনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওই চীনা প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক প্রতারণার মামলাও করেছে এবং তিনি ইউরোপের একাধিক দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

### সিন্ডিকেট ও দুদকের নীরবতা

অভিযোগ উঠেছে, টেশিসের বর্তমান মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও প্রশাসন) দেবাশীষ রায়, উপমহাব্যবস্থাপক (কোম্পানি সচিব) মোঃ জুলফিকার হায়দার, উপমহাব্যবস্থাপক (এইচআর) মোঃ রাকিব হাসান এবং উপমহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) বিশ্বাস মুরাদ হোসেনসহ একটি সুবিধাভোগী কর্মকর্তা চক্রকে বিপুল অঙ্কের উৎকোচ এবং চীন ভ্রমণের মাধ্যমে ম্যানেজ করে সৈয়দ মুনিরুজ্জামান তার লুটপাট কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালু রেখেছেন।

এসব বিষয়ে জানতে অ্যাডমির মালিক সৈয়দ মনিরুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযোগ ওঠা সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য, অর্থ ও হিসাব বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক বিশ্বাস মুরাদ হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

বিগত ফ্যাসিস্ট আমল থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক লুটপাটের বিরুদ্ধে গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর সুনির্দিষ্ট আবেদন করা হলেও, অদ্যাবধি দৃশ্যমান কোনো তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়নি। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্রাসকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুদকের অবিলম্বে কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাত বিশেষজ্ঞরা।
তবে দুদকের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে,  টেশিস এর লুটপাট নিয়ে দুদক কাজ করছে।