দুর্নীতির অভিযোগে পদোন্নতি স্থগিত রাখার মাত্র তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন সংস্থাটির দুই কর্মকর্তা। তারা হলেন পরিচালক (সাধারণ) মো. মাহমুদুল হক ও মো. মনসুর রহমান। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিভাগীয় মামলা এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার তথ্যও রয়েছে। এসব অভিযোগ ও তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় গত ১৮ আগস্ট প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে তাদের পদোন্নতি কার্যকর করা হয়।
অথচ এর মাত্র তিন মাস আগে, গুরুতর অভিযোগ, বিভাগীয় মামলা এবং দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের পদোন্নতি স্থগিত রেখেছিল বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক পদে পদোন্নতির জন্য গঠিত বাছাই ও নির্বাচন কমিটি।
বিএসইসির নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ২১ মে পদোন্নতির জন্য গঠিত বাছাই কমিটির তৃতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক (সাধারণ) মো. আনোয়ারুল ইসলাম, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. মো. ফরিদুর রহমান এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব ছানিয়া আক্তার উপস্থিত ছিলেন। সভার নথিতে বলা হয়, গুরুতর অভিযোগ, বিভাগীয় মামলা ও দুদকের অনুসন্ধানের মুখোমুখি থাকায় মাহমুদুল হক ও মনসুর রহমানের পদোন্নতি তখন স্থগিত রাখা হয়।
মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা
জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ১৪ নম্বরে থাকা পরিচালক (সাধারণ) মো. মাহমুদুল হক নির্বাহী পরিচালক (সাধারণ—দ্বিতীয় গ্রেড) পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচনাধীন ছিলেন। বাছাই কমিটির নথিতে তার চাকরির বৃত্তান্তকে ‘অত্যন্ত অসন্তোষজনক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তার বিরুদ্ধে বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের অনিয়মসংক্রান্ত একটি বিভাগীয় মামলায় চার্জশিট জারির তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২১ ও ২০২২ সালের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে তার বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করা হয়। ওই মন্তব্য প্রত্যাহার বা অবলোপন করা হয়নি বলেও বাছাই কমিটির নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া অননুমোদিত বিদেশ ভ্রমণের কারণে তাকে বরখাস্ত করার পূর্ববর্তী রেকর্ডের কথাও বলা হয়েছে।
ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার তথ্যও রয়েছে। একই সঙ্গে তার কূটনৈতিক ও অফিশিয়াল পাসপোর্ট বাতিলের ঘোষণার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নথি নিখোঁজের ঘটনায় নাম মনসুর রহমানের
জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ১৮ নম্বরে থাকা পরিচালক (সাধারণ) মো. মনসুর রহমানের এসিআর তুলনামূলক ভালো হলেও বিভিন্ন অনিয়মের তদন্তে তার নাম উঠে এসেছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
একমি পেস্টিসাইডস লিমিটেডের আইপিও-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি নিখোঁজ হওয়া এবং ফাইল প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে বিএসইসির অভ্যন্তরীণ তদন্তে তার নাম এসেছে। একই ঘটনায় দুদকও তথ্য চেয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া কোয়েস্ট বিডিসি লিমিটেডের বিতর্কিত অনুমোদনের সময় সংশ্লিষ্ট বিভাগে কর্মরত থাকায় ওই বিষয়েও তার ভূমিকা নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। এসব তদন্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার পদোন্নতির সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল।
তবে মনসুর রহমান অভিযোগগুলোর বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো তদন্ত চলছে কি না, তা তিনি জানেন না। পদোন্নতির জন্য গঠিত তদন্ত কমিটি সবকিছু যাচাই-বাছাই করে তাকে পদোন্নতির উপযুক্ত মনে করায় পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
তিন মাসের ব্যবধানে পদোন্নতি
বিএসইসি সূত্রের দাবি, দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণসহ বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত এখনো চলমান। অভিযোগ ও মামলা নিষ্পত্তির আগেই কীভাবে তাদের পদোন্নতি দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৮ আগস্ট বিএসইসির সহকারী পরিচালক (এইচআর) ইনজামুল হকের স্বাক্ষরে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাদের পদোন্নতির বিষয়টি জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ৩ জুন ২০২৬ থেকে ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা পাবেন। তবে ওই সময়ের জন্য তারা কোনো আর্থিক সুবিধা পাবেন না।
মো. মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালামের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনিও ফোন রিসিভ করেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তার জবাব দেননি।