ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:৫৪:২২ AM

উত্তর কাস্টমস বন্ডে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
24-08-2026 08:03:13 PM
উত্তর কাস্টমস বন্ডে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ

বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি, তিনি বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অনৈতিক সুবিধা আদায় করেছেন। বর্তমানে বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এও তার একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের ছত্রছায়ায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও কমিশনারের স্টাফ অফিসার গোলাম মোহাম্মদ হাসনাইন, কমিশনারের পিএ মজনু মিয়াসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হেডকোয়ার্টার পদ নিয়ে প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট থেকে বদলি হয়ে বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ যোগদানের পর প্রশাসনিক নিয়ম ও জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি উপেক্ষা করে তদবিরের মাধ্যমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’র পদে দায়িত্ব নেন। এরপর থেকেই বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ফাইল আটকে রাখা, অডিট কার্যক্রমে শিথিলতা, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বন্ড লাইসেন্স-সংক্রান্ত জটিলতার অজুহাতে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

বিশেষ করে ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসের কার্যক্রম ঘিরে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তবে এ অর্থের পরিমাণ বা অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সম্পদ নিয়ে অভিযোগ

মাসুমের বিরুদ্ধে অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ অর্জন। অভিযোগ অনুযায়ী, তার স্ত্রী সানজিদা আফরিন লিপির নামে রাজধানীর ভাটারা মৌজায় জমি কেনা হয়েছে। স্ত্রীর দৃশ্যমান কোনো বড় আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এসব সম্পদ অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে, ভাটারা মৌজার জেএল নম্বর ১৫, নামজারি খতিয়ান নম্বর ২৯৭১৬ এবং দাগ নম্বর ২০৭৬৩-এর জমি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭৫৬(IX-I) নম্বর নামজারি মামলার মাধ্যমে সানজিদা আফরিন লিপির নামে নেওয়া হয়।

তবে জমির পরিমাণ নিয়ে সরকারি নথিতে গরমিলের অভিযোগও রয়েছে। একটি নামজারি খতিয়ানে জমির পরিমাণ ০.৪০০০ একর বা ৪০ শতাংশ উল্লেখ থাকলেও ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডে ৪.৯৬ একর জমির তথ্য দেখা যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের হিসাবে, ভাটারা এলাকায় জমির বর্তমান বাজারমূল্য কাঠাপ্রতি ৬০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা হলে ৪০ শতাংশ জমির আনুমানিক মূল্য ১৫ থেকে ৩৬ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। আর ডিজিটাল রেকর্ডে উল্লেখিত ৪.৯৬ একর জমির মূল্য আরও অনেক বেশি। তবে জমির প্রকৃত মালিকানা, পরিমাণ ও বাজারমূল্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া মাসুমের স্ত্রী ও আত্মীয়দের নামে খুলনার সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও সম্পদ থাকার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজস্ব ব্যবস্থায় প্রভাবের অভিযোগ

কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থেকে কোনো কর্মকর্তা যদি ফাইল আটকে বা বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা দাবি করেন, তাহলে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন্ড কমিশনারেটের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ওই পদে বসে অনিয়ম হলে তার প্রভাব পুরো কমিশনারেটের কার্যক্রমে পড়তে পারে। তবে ওই কর্মকর্তার বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তদন্তের দাবি

ভুক্তভোগী কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তার আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য এবং দায়িত্ব পালনকালে তার স্বাক্ষর করা গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

তারা ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউস-সংক্রান্ত নথি অডিট, সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগকারীরা দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমকে উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে বদলি করার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে অভিযোগের কারণে তিনি নিজেই অন্যত্র বদলির চেষ্টা করছেন বলেও একটি সূত্র দাবি করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম, অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেন, গোলাম মোহাম্মদ হাসনাইন ও মজনু মিয়ার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।