ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:৫৫:৫৪ AM

৩ দিনেই ২৫ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন?

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
24-08-2026 07:54:35 PM
৩ দিনেই ২৫ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন?

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ জানানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া এই ওয়েবসাইটে পরিচয় গোপন রেখে সরকারি সেবায় ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন ভুক্তভোগীরা। চালুর প্রথম তিন দিনেই প্ল্যাটফর্মটিতে ১ হাজার ৮৫৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

‘ঘুষ.সাইট’-এর প্রতিষ্ঠাতা দুই বন্ধু সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ। বিদেশের একটি ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা বাংলাদেশের জন্য এই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছেন। উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের ঘুষ চাওয়ার বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাগুলো একটি প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা। এর মাধ্যমে কোন দপ্তর বা সরকারি সেবাকে ঘিরে কত অভিযোগ আসছে, তার একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন তারা।

তবে উদ্যোক্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ‘ঘুষ.সাইটে’ জমা দেওয়া তথ্যকে কোনো আইনি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও প্ল্যাটফর্মটির মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং নাগরিকদের অভিজ্ঞতা এক জায়গায় তুলে ধরে সরকারি সেবায় ঘুষের অভিযোগের ধরন ও প্রবণতা সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য।

যেভাবে কাজ করে ‘ঘুষ.সাইট’

ওয়েবসাইটটিতে অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল—এই পাঁচ ধরনের তথ্য দিতে হয়। চাইলে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণও যুক্ত করা যায়।

অভিযোগ জানাতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন নেই। উদ্যোক্তাদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি দুই মিনিটেরও কম সময়ে সম্পন্ন করা যায়। তবে সাইটে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, তার পদবি বা ফোন নম্বর উল্লেখ করার সুযোগ রাখা হয়নি।

উদ্যোক্তারা বলছেন, কোনো ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার চেয়ে কোন সরকারি দপ্তর বা সেবাকে ঘিরে বেশি অভিযোগ আসছে, সেটিই তুলে ধরতে চান তারা। অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সেটি সরাসরি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে মডারেশনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়। পাশাপাশি আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট কিংবা সাইটের নীতিমালা ভঙ্গকারী অভিযোগ বাদ দেওয়া হয়। এরপর বিভাগ, দপ্তর, সেবার ধরন, দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ এবং ঘটনার ফলাফলের ভিত্তিতে তথ্য প্রকাশ করা হয়।

তিন দিনে ১ হাজার ৮৫৬ অভিযোগ

উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চালুর প্রথম তিন দিনে ‘ঘুষ.সাইটে’ মোট ১ হাজার ৮৫৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ ২৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

অভিযোগের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বিভাগ। এই বিভাগ থেকে ৮৭৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে ৪৪১টি, রাজশাহী থেকে ১২২টি, খুলনা থেকে ১১৬টি, রংপুর থেকে ৯৮টি, সিলেট থেকে ৭৯টি, ময়মনসিংহ থেকে ৭১টি এবং বরিশাল থেকে ৬৫টি অভিযোগ এসেছে।

অভিযোগকারীদের মধ্যে ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ঘুষ দিতে অস্বীকার করেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্ল্যাটফর্মটির পক্ষ থেকে কোনো দাবি করা হয়নি।

নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালনা

উদ্যোক্তাদের দাবি, ‘ঘুষ.সাইট’ এখন পর্যন্ত তাদের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মটির আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই। বাইরের কোনো অর্থায়নও নেওয়া হয়নি। তবে সাইটে স্বেচ্ছা অনুদান দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সাইটটির উদ্যোক্তাদের একজন সাইফ কবির বলেন, তাদের কাছে উদ্যোগটির সাফল্যের মাপকাঠি শুধু ওয়েবসাইটে কত মানুষ প্রবেশ করলেন, তা নয়। সরকারি সেবা নিতে যাওয়ার আগে একজন নাগরিক যদি অন্যদের অভিজ্ঞতা দেখে বুঝতে পারেন কোথায় ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ বেশি এবং অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করার বিষয়ে সচেতন হতে পারেন, সেটিকেই তারা উদ্যোগটির সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

তাদের মতে, সরকারি সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নাগরিকদের তথ্য এক জায়গায় সংরক্ষিত হলে ঘুষের অভিযোগের ধরন, বিস্তার ও প্রবণতা সম্পর্কে একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি হতে পারে। তবে এসব তথ্যকে অভিযোগ হিসেবে দেখার পাশাপাশি এর সত্যতা যাচাই ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।