নিচে প্রতিবেদনটি প্রায় ৯০০ শব্দে, সংবাদপত্রের ভাষায় সংক্ষিপ্ত, শুদ্ধ ও ধারাবাহিকভাবে সম্পাদনা করে দিলাম। অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই রাখা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও ভারসাম্য রেখে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।গণপূর্তে অনিয়মের অভিযোগের কেন্দ্রে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানবদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন ও সনদ জালিয়াতির অভিযোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরে অনিয়মের এক ‘রাজত্ব’ গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার, জ্যেষ্ঠতার নিয়ম ভেঙে পদোন্নতি নেওয়া এবং বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকার পরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন খালেকুজ্জামান। এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলি-পদায়ন, পদোন্নতি ও টেন্ডার কমিশন আদায় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ পাওয়ার জন্য ফান্ড সংগ্রহের মতো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ঠেকানোর নামেও অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে।
৫ আগস্টের পর প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব, গড়েন সিন্ডিকেট
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরী প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব নেন। এরপর নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী রয়েছেন।
এ সিন্ডিকেট বদলি-পদায়ন ও টেন্ডারসংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনে প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রকৌশলী। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
লটারিতে স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যের অভিযোগ
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের বদলিতে লটারি চালু করা হলেও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারী প্রকৌশলীদের দাবি, লটারি শুরুর আগেই পছন্দের ও তদবির করা কর্মকর্তাদের নাম ঢাকার বাক্সে রাখা হয়।
তাদের অভিযোগ, নিজ জেলা বা পছন্দের কর্মস্থলে থাকতে আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এমনকি সাতজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে লটারির আওতার বাইরে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
বদলি প্রক্রিয়া নিয়ে দেওয়া একটি স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, নিজ জেলা বাদ দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে লটারির মাধ্যমে পদায়নের নিয়ম থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। কোনো বিভাগে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি হলে অতিরিক্ত কর্মকর্তাদের অপেক্ষাকৃত কম কর্মকর্তা থাকা বিভাগে দেওয়ার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে ঢাকায় পোস্টিং নিরুৎসাহিত করার কথা।
অভিযোগকারীদের দাবি, ‘অতিরিক্ত কর্মকর্তা’ দেখিয়ে আগে থেকেই নির্দিষ্ট কিছু প্রকৌশলীর নাম ঢাকা জেলার লটারির বাক্সে যুক্ত করা হয়। পরে তাদের নাম উঠিয়ে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে।
বদলি-পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬৫ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি বা পদায়নের সুযোগ করে দিতে ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেন হয়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
চলতি বছরের ৩ মার্চ এক দিনে পৃথক কয়েকটি প্রজ্ঞাপনে অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। এত বড় পরিসরে বদলির আগে মন্ত্রণালয়কে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলীকে তলব করে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তার ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে আগের গণবদলির অধিকাংশ বাতিল করা হয় বলে জানা গেছে।
ভুয়া পিএইচডি সনদের অভিযোগ
নথিপত্রের বরাতে জানা যায়, ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার করে উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটি ভোগের অভিযোগে খালেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধ রাখার মতো লঘুদণ্ড দেওয়া হয়।
এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং পরে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে এক বছরের মধ্যে তিনি দুই দফা পদোন্নতি পান।
১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে খালেকুজ্জামান প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলে তিনি দেশে ফিরে আসতেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে মামলা ব্যবহারের অভিযোগ
প্রধান প্রকৌশলীর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে সরিয়ে দিতে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা সংক্রান্ত তথ্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি) পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে।
কয়েকজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীর দাবি, জুলাইয়ের রাজনৈতিক সহিংসতার পর রামপুরা থানায় দায়ের করা একটি মামলায় কৌশলে ৪৭ প্রকৌশলীর নাম যুক্ত করা হয়। পরে ওই মামলার নথি পদোন্নতি যাচাইয়ের সময় ব্যবহার করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় খালেকুজ্জামানের ওপরে থাকা কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে তাকে পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকায় শীর্ষে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদন
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও অনেকে। দুর্ঘটনার পর ভবনটির নকশা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরবর্তী তদন্তে জানা যায়, ২০১১ সালে ভবনটির নকশা অনুমোদনের সঙ্গে তৎকালীন রাজউক অথরাইজড অফিসার মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নামও ছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে ভবনটিতে পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ও নিরাপদ সিঁড়ির ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে। অভিযোগকারীদের দাবি, নকশা অনুমোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের দায়ও তদন্তে যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।
অভিযোগ অস্বীকার খালেকুজ্জামানের
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে কোনো অনিয়ম হয়নি। বিষয়টি মন্ত্রণালয় অবগত রয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্বাহী প্রকৌশলীরা। তাদের বদলি লটারির মাধ্যমে নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে করা হবে।
জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী মনে করে তাদের বিরুদ্ধে মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তার ভাষ্য, ‘আমার কোনো প্রতিযোগী নেই।’
যা বলছে মন্ত্রণালয়
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলিতে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করা হবে না—এ কথা বলার দায়িত্ব প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়নি।
প্রধান প্রকৌশলীর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে মামলা সংক্রান্ত নথি পাঠানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মকর্তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীকে নিয়েও বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে এবং বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন।
তিনি বলেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় খালেকুজ্জামানের ওপরে কর্মকর্তা রয়েছেন। প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগের জন্য গ্রেড-১ পদে যোগ্যতা যাচাই করতে বিষয়টি এসএসবিতে পাঠানো হয়েছে। তালিকা ও বিধি অনুযায়ী যিনি যোগ্য হবেন, তাকেই প্রধান প্রকৌশলী করা হবে।