ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০২:৩৩:০৩ AM

শ্রমিকদের ৯২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
23-07-2026 08:53:44 PM
শ্রমিকদের ৯২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত তালিকাচ্যুত শিল্পপ্রতিষ্ঠান আশরাফ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড–এর বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারী ও শ্রমিক-কর্মচারীদের অন্তত ৯২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিশেষ তদন্ত এবং এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে এ অভিযোগের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। তদন্তে বলা হয়েছে, কোম্পানির জমি ও বাণিজ্যিক স্পেস বিক্রির অর্থের বড় অংশের কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিএসইসির তদন্তে দেখা যায়, আশরাফ টেক্সটাইলের জমি ও বাণিজ্যিক স্পেস বিক্রির মোট ৭২ কোটি ১ লাখ টাকার হিসাব অস্পষ্ট। এছাড়া শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির অন্তত ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে আত্মসাতের সম্ভাব্য অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ৯২ কোটি টাকা।

কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৬০ দশমিক ৮৩ শতাংশ সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের হাতে ছিল। কিন্তু তাদের অজ্ঞাতসারে টঙ্গীর ৪২ বিঘা জমি এবং একটি ৭ বিঘার বাণিজ্যিক প্রকল্পে কোম্পানির অংশীদারত্ব বিক্রি করা হয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএসইসির তদন্তে অভিযোগের মূল দায়ী ব্যক্তি হিসেবে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ আলী মৃধা এবং তার সহযোগীদের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে চলতি বছরের মে মাসে বিএসইসি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায়। বিএসইসির এক কর্মকর্তা জানান, তদন্তে অর্থপাচার ও আর্থিক জালিয়াতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পরই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ কোম্পানির আনুষ্ঠানিক ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মূলধন এবং শ্রমিকদের পাওনা অর্থও যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়নি। তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত আশরাফ টেক্সটাইল মিলস ১৯৮৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। পরে ১৯৮৪ সালের আইপিওর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু পুরোনো যন্ত্রপাতি ও ঋণের চাপের কারণে ২০০৬ সালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং ২০০৯ সালে কোম্পানিটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত হয়।

বিএসইসির তদন্তে আরও বলা হয়েছে, পরিচালকদের হাতে থাকা শেয়ারের পরিমাণ ২০১৩ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তকারীদের মতে, এতে তৎকালীন সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে, কারখানার জমির একটি অংশ বিক্রির অর্থ দিয়ে আধুনিক বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতি নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেতু করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে একটি বহুতল মার্কেট নির্মিত হলেও বর্তমানে সেখানে আশরাফ টেক্সটাইলের কোনো কার্যকর মালিকানা বা অংশীদারত্ব নেই।

২০০৯ সালে কোম্পানির মালিকানাধীন ৬৬ হাজার ৮১৮ বর্গফুট বাণিজ্যিক স্পেস প্রতি বর্গফুট ১ হাজার ২৭২ টাকা দরে মোট ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি দেখানো হয়। কিন্তু অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, একই সময়ে ওই এলাকায় দোকানের বাজারমূল্য ছিল প্রতি বর্গফুট দুই হাজার টাকারও বেশি। ফলে বিক্রয়মূল্য বাজারদরের তুলনায় কম দেখানো হয়েছে এবং এ অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাবও পাওয়া যায়নি।

এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে কোম্পানির ৪২ দশমিক ২২ বিঘা জমি কর্ণফুলী ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ৮৫ কোটি টাকায় বিক্রি দেখানো হয়। বিএসইসির তদন্ত অনুযায়ী, সরকারি মৌজা মূল্য অনুযায়ী জমিটির মূল্য ছিল ১৩৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ সরকারি সর্বনিম্ন মূল্য থেকেও ৫১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা কমে জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এ লেনদেনের উল্লেখযোগ্য অংশের স্বচ্ছ হিসাব উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

শ্রমিকদের পাওনা অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। কোম্পানি দাবি করেছে, বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি বাবদ ১৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো পর্যাপ্ত ব্যাংকিং নথি বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়নি। অন্যদিকে পূর্ববর্তী নিরীক্ষা প্রতিবেদনে শ্রমিকদের প্রকৃত পাওনা এর তুলনায় অনেক কম দেখানো হয়েছিল। এ কারণে বিএসইসির তদন্তে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

এ বিষয়ে আশরাফ টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ আলী মৃধা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ঋণের চাপে ছিল। ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতার কারণে সম্পদ কাঙ্ক্ষিত মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও বলেন, সে সময় ব্যাংকিং ব্যবস্থা ডিজিটাল না থাকায় সব আর্থিক নথি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। পাশাপাশি তিনি জানান, হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোম্পানির কার্যক্রম বজায় রাখা হয়েছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

সার্বিকভাবে, আশরাফ টেক্সটাইল মিলসকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগ দেশের পুঁজিবাজারে সুশাসন, করপোরেট জবাবদিহি এবং শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই নির্ধারিত হবে।