ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ১১:২৯:০৭ PM

শাহজালালে কার্গো অব্যবস্থাপনা,বাড়ছে ক্ষতি

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
29-09-2026 03:01:29 PM
শাহজালালে কার্গো অব্যবস্থাপনা,বাড়ছে ক্ষতি

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমদানি করা হাজার কোটি টাকার পণ্য রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের ১৮ অক্টোবর বিমানবন্দরের একমাত্র কার্গো ভিলেজ ও এর সামনে থাকা প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার বর্গফুটের স্থায়ী শেড আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর নতুন করে কোনো স্থায়ী শেড নির্মাণ করা হয়নি। ফলে বিদেশ থেকে আসা বিপুল পরিমাণ পণ্য খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে। শেড না থাকলেও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত স্টোর চার্জ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আমদানিকারকেরা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগুনের পর দ্রুত নতুন কার্গো শেড নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রায় ১১ মাসেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এদিকে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে বিভিন্ন ধরনের আমদানি পণ্য ভিজে নষ্ট হচ্ছে। এতে বিশেষ করে সীমিত মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করা তরুণ উদ্যোক্তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে ৫০টি ফ্লাইট অবতরণ করে। এর মধ্যে ৮ থেকে ১০টি চার্টার কার্গো ফ্লাইট এবং ৪০ থেকে ৪৫টি যাত্রীবাহী ফ্লাইট। এসব ফ্লাইটে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিদিন ৬০০ টনের বেশি আমদানি পণ্য আসে। চার্টার কার্গো ফ্লাইটের পণ্য খালাস হতে গড়ে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। ফলে বিমানবন্দরে প্রতিনিয়ত দুই থেকে আড়াই হাজার টন পণ্য মজুত থাকে। এসব পণ্যের জন্য ব্যবসায়ীদের গড়ে ২০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্টোর চার্জ দিতে হয়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থায়ী শেড না থাকায় পণ্যগুলো খোলা জায়গায় রাখা হচ্ছে। এতে রোদ-বৃষ্টিতে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে ঢাকায় ২০ দিন এবং আগস্টে ১৫ দিন বৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টির সময় বিমানবন্দরের খোলা জায়গায় থাকা বিভিন্ন পণ্য ভিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পণ্য পুরোপুরি নষ্টও হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন নতুন উদ্যোক্তারা। চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা মোবাইল ফোনের আনুষঙ্গিক পণ্য, গ্যাজেট ও ইলেকট্রনিকস সামগ্রী পানিতে নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি গার্মেন্টস ও ওষুধশিল্পের আমদানিকারকেরাও সমস্যায় পড়েছেন। খোলা জায়গায় রোদ-বৃষ্টির মধ্যে রাখার কারণে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালের মানও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য চীন থেকে পণ্য আমদানি করে স্কাইবাই বিডি। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রাসেল বিন আহাদ বলেন, গত বছর কার্গো শেডে আগুন লাগার ঘটনায় তাঁদের প্রায় আড়াই কোটি টাকার পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজস্ব বোর্ডের সফটওয়্যারে আমদানি দেখানো থাকায় ওই পণ্যের জন্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা শুল্কও দিতে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সব ধরনের নিয়ম মেনে ক্ষতি মেনে নেওয়ার পরও গত ১১ মাসে নতুন কোনো শেড নির্মাণ করা হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার পণ্য আমদানির পর খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে।

রাসেল বিন আহাদ আরও বলেন, প্রতিটি পণ্যের জন্য স্টোর চার্জ নেওয়া হলেও কার্যত সেখানে পর্যাপ্ত স্টোরেজ সুবিধা নেই। এতে তরুণ উদ্যোক্তাদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যবসায়িক সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিমানবন্দরের এমন পরিস্থিতি বিদেশি ব্যবসায়ীদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক উদ্যোক্তা জানান, অল্প মূলধন নিয়ে তিনি গ্যাজেট আমদানি করেন। বৃষ্টির সময় তাঁর চোখের সামনেই পণ্য ভিজে গেলেও তা রক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে না। তাঁর দাবি, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ত্রিপল না পেয়ে বাইরে থেকে নিজের অর্থে ত্রিপল কিনে পণ্য ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এ সময় তাঁকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ব্যবসায়ীদের নিজেদের অর্থে অস্থায়ী বা স্থায়ী শেড নির্মাণের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান ওই উদ্যোক্তা।

ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল কবির ভূঁইয়া মিঠু বলেন, খোলা আকাশের নিচে মাটিতে পণ্য পড়ে থাকলে বৃষ্টির পানি ওপর থেকে পড়বে এবং নিচ থেকেও পানি উঠবে—এটাই স্বাভাবিক। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কার্গো শেডের সংস্কারকাজ দীর্ঘ সময়েও শেষ না হওয়াকে তিনি বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগীব সামাদ বলেন, বিমানবন্দরে যে পরিমাণ কার্গো আসছে, সে অনুযায়ী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকেরা দ্রুত পণ্য খালাস করছেন না। ফলে জায়গার সংকট তৈরি হচ্ছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত করে নতুনভাবে চালু করা সহজ কাজ নয় বলেও জানান তিনি।

রাগীব সামাদ বলেন, বর্ষাকালে বৃষ্টিতে পণ্য ভেজার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের জানা আছে। তবে কনসাইনমেন্ট আসার পর দ্রুত পণ্য খালাস করা হলে এ ধরনের পরিস্থিতি অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। বিমানবন্দরের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়ার অপেক্ষায় রেখে বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত করা হলে আমদানি পণ্যের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। তাই দ্রুত পর্যাপ্ত শেড ও সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্টোর চার্জ আদায়ের যৌক্তিকতা নিয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।