বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন বিএনপির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি থেকে যাত্রা শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পথ পেরিয়ে ১৯৮৪ সালে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। নিজের রাজনৈতিক দক্ষতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তার কারণে ধীরে ধীরে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর একটি ছিল ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে পরাজিত করা।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর খোকা মন্ত্রিসভায় স্থান পান। এর আগে ২০০২ সালে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজধানীর রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেন। মেয়র ও মন্ত্রী—দুই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় জাতীয় রাজনীতি ও ঢাকার স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় তাঁর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের সময় থেকেই ঢাকার বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন নেতার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। বিশেষ করে সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসকে কেন্দ্র করে ঢাকার বিএনপিতে পৃথক বলয় গড়ে ওঠার বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে আলোচিত ছিল। দলীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজধানীর রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখার প্রশ্নে এই বলয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
২০০৭ সালে নির্ধারিত সময়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় খোকা মেয়রের দায়িত্বে থেকে যান। ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, জরুরি অবস্থার সময়কার পরিস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেও তিনি দীর্ঘদিন ঢাকার রাজনীতিতে নিজের অবস্থান ধরে রাখেন। ২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে উত্তর ও দক্ষিণ—দুই ভাগে বিভক্ত করার পর অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে তাঁর দায়িত্বের অবসান ঘটে।
খোকার রাজনৈতিক জীবনের এই অধ্যায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থান নেওয়ার আলোচনা থাকলেও ঢাকার রাজনীতিতে তাঁর সাংগঠনিক প্রভাব দীর্ঘদিন বজায় ছিল। তাঁর জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক যোগাযোগ তাঁকে বিএনপির রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখে পরিণত করেছিল।
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে ইশরাক হোসেন ঢাকার রাজনীতিতে নিজের অবস্থান গড়ে তোলেন। বাবার রাজনৈতিক পরিচয়, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা এবং রাজধানীর রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে ইশরাককে অনেকেই খোকার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে বাবার উত্তরাধিকার ধরে রাখার পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করাও তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে তাঁর মন্ত্রিসভার দায়িত্ব এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে। তথ্য অনুযায়ী, মেয়র নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র প্রদর্শন করে শোডাউন করার অভিযোগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বলেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে দলীয় বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজনের আগেই তিনি পদত্যাগ করেন।।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ইশরাকের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত, তিনি কি বাবার মতো ঢাকার রাজনীতিতে শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন? দ্বিতীয়ত, দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারবেন কি না?
ঢাকার রাজনীতিতে সাদেক হোসেন খোকার প্রভাব ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ফল। ইশরাকও রাজধানীর রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। তবে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিতি তাঁর জন্য যেমন রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করে, তেমনি নিজের নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রমাণের চাপও বাড়ায়।
মন্ত্রী থাকুন কিংবা না থাকুন, ইশরাক হোসেন ঢাকার রাজনীতিতে কতটা প্রভাবশালী থাকবেন, তা নির্ভর করবে তাঁর সাংগঠনিক শক্তি, দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকৌশলের ওপর। সাদেক হোসেন খোকার উত্তরাধিকার তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে; সেই উত্তরাধিকারকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করাই এখন তাঁর বড় পরীক্ষা।