ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৩:০৩:৪৩ AM

৩৪২ কোটি টাকার কাজ বাগালেন যেভাবে

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
21-10-2026 08:49:17 PM
৩৪২ কোটি টাকার কাজ বাগালেন যেভাবে

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুটি সরকারি ক্রয়চুক্তিতে ৩৪২ কোটি ৭০ লাখ টাকার কেনাকাটা ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ এবং নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এড়িয়ে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডকে (ডিইডব্লিউ) সামনে রেখে এসব চুক্তি সম্পন্ন করা হয়। তবে চুক্তির আর্থিক সুবিধার বড় অংশ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে যাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে, যার মালিকদের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের পরিবারের সম্পর্ক রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, দুটি চুক্তির একটি হলো সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার ট্যাবলেট কেনা এবং অন্যটি প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ২১ কোটি ৯৯ লাখ টাকার হুইলচেয়ার সরবরাহ। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

তিন প্রতিষ্ঠানের চুক্তি, লাভের ভাগ নিয়ে প্রশ্ন
গত আগস্টে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও ডিইডব্লিউর মধ্যে ৬৬ হাজার ৮১৫টি অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট সরবরাহের চুক্তি হয়। প্রতিটি ট্যাবলেটের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪৮ হাজার টাকা। চুক্তির পরদিন, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ডিইডব্লিউ, স্যালস্ট্রা লিমিটেড এবং বুরাক ব্রেক লিমিটেডের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় যৌথ ব্যবসায়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চুক্তির বিবরণ অনুযায়ী, ডিইডব্লিউ মূলধন বিনিয়োগ, পরিচালন ব্যয় কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষতির দায় না নিয়েই মোট চুক্তিমূল্যের ৪ শতাংশ, প্রায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা পাওয়ার কথা। অন্যদিকে, ট্যাবলেট আমদানি ও সরবরাহের জন্য স্যালস্ট্রা লিমিটেডের বরাদ্দ প্রায় ১৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কর ও অন্যান্য নির্ধারিত ব্যয় বাদে অবশিষ্ট মুনাফা বুরাক ব্রেক লিমিটেডের ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার কথা। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, সম্ভাব্য কর বাদ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আয় হতে পারে প্রায় ৬৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।

বুরাক ব্রেক ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর নিবন্ধিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির দুই পরিচালক সরদার রাফিন এস এ হোসেন ও অনিকা রাইদা লিয়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী বকুলের ভাতিজা-ভাতিজি এবং তাঁদের বাবা সরদার তোফাজ্জল হোসেন লিয়াকত মন্ত্রীর ছোট ভাই বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য সরবরাহে পূর্ব অভিজ্ঞতা ও কাজের রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বাজারদরের চেয়ে বেশি মূল্য নির্ধারণের অভিযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি Xtra XT1 ট্যাবলেটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ হাজার টাকা। অথচ যৌথ চুক্তিতে স্যালস্ট্রার সরবরাহমূল্য দেখানো হয়েছে ২৬ হাজার ৮২৮ টাকা। বাজারে কীবোর্ডসহ কয়েকটি তুলনীয় ট্যাবলেটের দামও সরকারি ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম বলে দাবি করা হয়েছে। এ কারণে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে পণ্যের সুনির্দিষ্ট কনফিগারেশন, ওয়ারেন্টি, সফটওয়্যার, সংযোজিত সেবা, কর ও সরবরাহ ব্যয় যাচাই না করে শুধু বাজারদরের তুলনায় চূড়ান্ত আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

হুইলচেয়ার কেনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৬ হাজার হুইলচেয়ারের প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছে ৮ হাজার ১৭৫ টাকা। অথচ স্থানীয় খুচরা বাজারে সাধারণ ফোল্ডিং হুইলচেয়ারের দাম ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং বৃহৎ পরিমাণে আমদানিতে আরও কম হতে পারে। পাশাপাশি ২ হাজার পা-চালিত সেলাই মেশিন প্রতিটি ১৪ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা হয়েছে। মেশিনের উৎপাদনক্ষমতা সম্পর্কেও নথিতে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত মডেলের সক্ষমতার অসংগতির অভিযোগ উঠেছে।

মান পরীক্ষায় ব্যর্থ হুইলচেয়ার
হুইলচেয়ার সরবরাহের মান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক মান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান এসজিএস (SGS) ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৫৪৮টি হুইলচেয়ারের একটি চালান থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ১২৫টি পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৩০টিতে গুরুতর ত্রুটি পাওয়া যায়। পরীক্ষিত হুইলচেয়ারের আসন ও পেছনের অংশে উন্মুক্ত ধাতব তার, ধারালো প্রান্ত এবং চাকা ও ব্রেকের নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চাকার মান যাচাইয়ে বাধা দেওয়া হয় এবং পরিদর্শকদের প্রয়োজনীয় পণ্যের বিবরণ সরবরাহ করা হয়নি। এসজিএস চালানটিকে ‘Not-Conform’ বা মানদণ্ডবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এমন ত্রুটি নিশ্চিত হলে তা ব্যবহারকারীদের, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের, জন্য গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই চালান গ্রহণ, অর্থ পরিশোধ এবং ত্রুটিপূর্ণ পণ্য প্রতিস্থাপনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা জরুরি।

সরকারি নির্দেশনা ও ক্রয়বিধি নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় পাঠানো এক নির্দেশনায় সামরিক বাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আলোচিত চুক্তি দুটির ক্ষেত্রে সেই অনুমোদনের নথি পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২৪ আগস্টের চুক্তিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০০৮-এর ৫৪ ধারা উল্লেখ করার বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মূল্যায়ন কমিটি গঠনের পর অল্প সময়ের মধ্যে দরপ্রস্তাব যাচাই ও চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া নিয়েও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) প্রস্তাব বিবেচনা না করার কারণও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক যোগাযোগ ও জবাবদিহির দাবি
প্রতিবেদনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং সরদার তোফাজ্জল হোসেন লিয়াকতের বৈঠকের ছবি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বৈঠকে উপস্থিতি একাই অনিয়মে সম্পৃক্ততার প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ অস্বীকার করে থাকলে তাঁদের বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক নথিও তদন্তে বিবেচনা করা জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এসপিআইআরআইটি (SPIRIT) প্রকল্পের আওতায় এসব কেনাকাটার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। ক্রয়চুক্তি, ব্যাংক গ্যারান্টি, পণ্যের মান পরীক্ষার প্রতিবেদন, মূল্য নির্ধারণ এবং অর্থের চূড়ান্ত সুবিধাভোগীদের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগের অসত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। সরকারি অর্থের সুরক্ষা এবং সুবিধাভোগী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।