ঢাকা, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৩:৩১:৪৭ AM

মিরসরাইয়ে প্রকল্পের অর্থ লুট, আসামি ১৩ জন

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
31-10-2026 08:39:14 PM
মিরসরাইয়ে প্রকল্পের অর্থ লুট, আসামি ১৩ জন

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) ও ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ করের প্রকল্পে ১ কোটি ১৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক সদস্য এবং সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী।

গত বৃহস্পতিবার দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর এ মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।

দুদক সূত্রে জানা যায়, মিরসরাই উপজেলার ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) বিভিন্ন প্রকল্প এবং ২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ করের অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

অনুসন্ধানে উঠে আসে, দুটি খাতের আওতায় বাস্তবায়িত ৯০টি প্রকল্পে মোট ১ কোটি ১৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইজিপিপির ৩৫টি প্রকল্পে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ করের ৫৫টি প্রকল্পে ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ইজিপিপির মূল উদ্দেশ্য কর্মক্ষম অতিদরিদ্র মানুষের জন্য স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং তাঁদের আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে করেরহাট ইউনিয়নের প্রকল্পগুলোতে শ্রমিক নির্বাচন থেকে শুরু করে বিল-ভাউচার প্রস্তুত পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রকল্পের তালিকায় থাকা প্রায় ৫৮ জন শ্রমিকের জবানবন্দি এবং তাঁদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করে নানা অসংগতি পায় দুদক। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা এবং ইউপি সদস্যদের শ্রমিক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট নথিতে মৃত ব্যক্তি হিসেবে নাসির আহাম্মদ, মো. হারুন, মো. মোস্তফা, হাসনা বানু, রতন ত্রিপুরা, মো. খুরশেদ আলম ও হাসিনা বেগমের নাম উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে প্রবাসী হিসেবে মো. লিটন মিয়া, মো. তারেক ও ইলিয়াসের নাম পাওয়া গেছে। তাঁদের নামেও প্রকল্পের শ্রমিক হিসেবে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং অর্থ জমা ও উত্তোলনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক।

দুদকের অভিযোগ, ভুয়া চেক ও টিপসই ব্যবহার করে এসব ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। প্রকৃত শ্রমিকদের ব্যাংকে নিয়ে হিসাব খোলা হলেও তাঁদের দিয়ে প্রকল্পে সর্বোচ্চ চার-পাঁচ দিন কাজ করানো হতো। শ্রমিকদের কেউ কেউ মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অনেকে আবার সর্বোচ্চ দুবারের বেশি ব্যাংকে গিয়ে টাকা তোলেননি।

ব্যাংক হিসাবের বিবরণী বিশ্লেষণ করে দুদক জানতে পারে, শ্রমিকদের ৯০ শতাংশের বেশি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৭২ হাজার টাকা করে জমা ও উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। অথচ প্রকৃত শ্রমিকদের প্রাপ্ত অর্থের সঙ্গে এসব লেনদেনের সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইজিপিপি-সংক্রান্ত একটি মামলায় ৩৫টি প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পগুলোর অনুমোদনকারী হিসেবে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান মো. এনায়েত হোসেন নয়ন এবং বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মিলন বড়ালের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

অন্য মামলায় ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ করের অর্থায়নে বাস্তবায়িত ৫৫টি প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির মাধ্যমে ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত কাজকে ইজিপিপি এবং ইউনিয়ন পরিষদের করের প্রকল্পের কাজ হিসেবে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।

দুই মামলার আসামিরা হলেন করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. এনায়েত হোসেন নয়ন, সাবেক ইউপি সদস্য কল্পনা রানী চক্রবর্তী, শেলী মজুমদার, তাহেরা বেগম, মো. আবু তাহের (মাস্টার), মো. শহীদ উল্লাহ, মো. বেলাল উদ্দিন, ফেয়ার মিয়া মিন্টু, মো. মহিউদ্দিন, মো. সফি আহাম্মদ, মো. আজাদ উদ্দিন, কোরবান আলী এবং সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মিলন বড়াল।

মামলার বাদী দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে।