রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অধিগ্রহণ করা প্রায় সাড়ে চার একর জমি দখল করে প্লট, মার্কেট ও বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে শমসের আলী নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। গৃহায়নের নথিতে সংশ্লিষ্ট জমির বরাদ্দ, লিজ ও দখল হস্তান্তরের তথ্য না থাকলেও সেখানে গড়ে উঠেছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। জমির একটি অংশ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করারও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি হিসাবে জমিটির মূল্য ২১৫ থেকে ৩০০ কোটি টাকা হলেও বর্তমান বাজারমূল্য ৪০০ থেকে ৬৫০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মিরপুর-১-এর শাহ আলী নগর বা শমসের নগর এলাকায় অবস্থিত এই জমি ঢাকা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (ডুইপ) আওতায় নিম্নবিত্তদের আবাসনের জন্য সংরক্ষিত ছিল। প্রকল্পের অধীনে ১৯৪টি আবাসিক প্লট তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গৃহায়নের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় জাল কাগজপত্র তৈরি করে জমি দখল ও বিক্রি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অধিগ্রহণ করা হয় ২০২ একর জমি
নথিপত্র অনুযায়ী, মিরপুরের বিশিল মৌজার জে এল নম্বর ২২৪-এর ১৩/৫৯-৬০ নম্বর এলএ কেসের মাধ্যমে মোট ২০২ দশমিক ৪৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৯৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর তৎকালীন গৃহসংস্থান অধিদপ্তরের নামে জমিটি বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়। এর আগে ১৯৯৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ওই এলাকার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেখানে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও প্রাতিষ্ঠানিক প্লটের পাশাপাশি খেলার মাঠ, স্কুল, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনার জন্য জমি নির্ধারণ করা হয়।
গৃহায়নের নথিতে বলা হয়েছে, মিরপুর গৃহসংস্থান বিভাগ-২-এর আওতাধীন ডুইপ প্রকল্পে ১৯৪টি আবাসিক প্লট রাখা হয়েছিল। প্রতিটি প্লটের আয়তন ৪০ বর্গমিটার। কিন্তু এসব প্লট কোনো ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। সংরক্ষিত দখল রেজিস্ট্রারেও দখল হস্তান্তরের তথ্য নেই। সংশ্লিষ্ট জমির লিজ দলিল সম্পাদনের রেকর্ডও কর্তৃপক্ষের কাছে নেই বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুয়া ইজারা দলিলের অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শমসের আলী নিজেকে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে অফিসে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। একপর্যায়ে অফিসে বসা, নথিপত্র আনা-নেওয়া ও সংরক্ষণের কাজেও যুক্ত হন। পরে গৃহায়নের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে জমির কাগজপত্র তৈরি করে তা প্লট আকারে বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে তাঁদের কাউকে নামমাত্র মূল্যে প্লট দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
নথি অনুযায়ী, শমসের আলী, প্রোপ্রাইটর—শাহআলী নগর হাউজিং এস্টেট, মিরপুর-১-এর নামে ২০০০ সালের ২০ এপ্রিল ২১১৭ নম্বরের একটি ইজারা দলিল করা হয়। এতে চারটি দাগে ৪ দশমিক ২৬৬৬ একর জমির দাবি করা হয়েছে। দলিলে লিজদাতা হিসেবে সহকারী কমিশনার সেটেলমেন্ট, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ের রেকর্ডরুমে অনুসন্ধান করে শমসের আলীর নামে ওই জমি ইজারা দেওয়ার কোনো নথি পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
জমিতে ভবন, মার্কেট ও বসতি
সরেজমিনে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার জমিতে আবাসিক ভবন, মার্কেট, দোকানপাট, কারখানা ও রিকশার গ্যারেজ গড়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও মসজিদ ও স্কুলও রয়েছে। কয়েকটি স্থাপনায় বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। জমির মালিকানা দাবি করা ব্যক্তিদের কেউ কেউ সেখানে বসবাস করছেন, আবার কেউ ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সমিতির নামে জমি বরাদ্দের দাবিসংবলিত সাইনবোর্ডও দেখা গেছে।
গৃহায়নের কর্মকর্তাদের দাবি, এসব স্থাপনার বৈধতা ও জমির মালিকানা যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিতে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ ও উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর তথ্য রয়েছে।
জমির মালিকানা নিয়ে মামলা
সরকারি জমির মালিকানা দাবি করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করেছেন শাহআলী নগর হাউজিং এস্টেটের আব্দুল মতিন। মামলায় তিনি ৬১ জনের পক্ষে বাদী হয়েছেন। আরজিতে দাবি করা হয়েছে, বিশিল মৌজার বিভিন্ন দাগের জমি উত্তরাধিকার, আমমোক্তারনামা, লিজ, নামজারি ও খাজনা পরিশোধের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভোগদখল করেছেন। পরে প্লট, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো তৈরি করে জমি বিক্রি করা হয়। বাদীপক্ষের দাবি, অনেক ক্রেতার নামে সাব-কবলা দলিলও সম্পাদিত হয়েছে।
অন্যদিকে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নথিতে এসব জমির বরাদ্দ ও লিজের তথ্য না থাকায় সংশ্লিষ্ট দলিলগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জমির মালিকানা দাবি করে ২০১৭ সালে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ রাখার দাবিতে হাইকোর্টে রিটও করা হয়েছে। ফলে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধ এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাও রয়েছে। সরকারি অধিগ্রহণ করা জমিতে প্লট তৈরি করে বিক্রি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দারুস সালাম থানায় ৭ নম্বর মামলা করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলাটি চলমান রয়েছে। গৃহায়নের সাবেক কর্মচারী নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে শমসের আলীকে সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচার ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
পরিবারের বক্তব্য ও কর্তৃপক্ষের অবস্থান
শমসের আলীর মৃত্যুর পর তাঁর মেয়ে শমসের আরা সাথী জমিসংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখাশোনা করছেন। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁর বাবা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে জমি বিক্রি করেছেন। তাঁদের পরিবারের নামে কোনো জমি দেওয়া হয়নি। জমির কাগজপত্র সম্পর্কে তিনি জানেন না এবং মৃত্যুর আগে তাঁর বাবা কোনো নথিপত্র তাঁদের বুঝিয়ে দিয়ে যাননি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, গেজেটভুক্ত সরকারি জমি কেউ দখল করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জমি উদ্ধারে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি জানান, ডুইপ প্রকল্পের আওতায় নিম্নবিত্তদের জন্য ১৯৪টি আবাসিক প্লটের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
সরকারি নথিতে বরাদ্দ বা লিজের তথ্য না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে জমির নামজারি, সাব-কবলা দলিল ও পরবর্তী হাতবদল হয়েছে, তা তদন্তের দাবি রাখে। একই সঙ্গে প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত জমি উদ্ধার এবং প্রকৃত ক্রেতাদের দাবির আইনি নিষ্পত্তি—দুই ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ এখন গুরুত্বপূর্ণ।