ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৬:৩৪:২০ PM

ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির কঠিন চ্যালেঞ্জ

মান্নান মারুফ
23-10-2026 04:07:04 PM
ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির কঠিন চ্যালেঞ্জ

রাজধানী ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি, জনসমর্থন ও নির্বাচনী সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে স্থানীয় পর্যায়ে দলের নেতৃত্ব, নেতাদের পারস্পরিক সমন্বয় এবং তৃণমূলের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের ওপর। একসময় ঢাকার বিএনপির রাজনীতিতে সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের নেতৃত্বে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। বিশেষ করে সাদেক হোসেন খোকা ঢাকার রাজনীতিতে যে জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক প্রভাব তৈরি করেছিলেন, তা দীর্ঘদিন দলটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুর পর ঢাকার রাজনীতিতে তাঁর পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে ছেলে ইশরাক হোসেনের উত্থান ঘটে। ইশরাকের রাজনৈতিক অবস্থান শুধু দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পুরান ঢাকার একটি অংশে তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য, ব্যক্তিগত পরিচিতি এবং স্থানীয় জনসম্পৃক্ততাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঢাকার রাজনীতিতে তাঁর মতো নেতাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে দলীয় অবস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক অবদানও বিবেচনায় নিতে হবে।

ঢাকার রাজনীতিতে নেতৃত্বের ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ

রাজধানীতে বিএনপির রাজনীতি পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে যেসব নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন, তাঁদের মধ্যে মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শামসুজ্জামান দুদু, আমানউল্লাহ আমান, ইশরাক হোসেন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, আমিনুল হক, এম এ কাইয়ুম, সাইফুল ইসলাম নিরব, এস এম জাহাঙ্গীর ও তানভীর আহমেদ রবিনের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক যোগাযোগ, কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিজ নিজ এলাকায় প্রভাব বিএনপির রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

তবে এসব নেতার রাজনৈতিক অবস্থান, প্রভাব ও সাংগঠনিক সক্ষমতা এক রকম নয়। কেউ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিক, কেউ আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে পরিচিতি অর্জন করেছেন, আবার কেউ নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। তাই সবাইকে একই মানদণ্ডে বিচার না করে তাঁদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক অবদান অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, অভিজ্ঞ নেতৃত্বের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের নেতাদের সমন্বয় ঘটানো। পুরোনো নেতাদের অভিজ্ঞতা যেমন দলের জন্য প্রয়োজন, তেমনি তরুণ ও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় নেতাদের উদ্যম, জনসম্পৃক্ততা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

উপেক্ষা ও কোন্দলে বাড়াতে পারে রাজনৈতিক ঝুঁকি

রাজনীতিতে পদ-পদবি বা সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে নেতাকর্মীদের মনোবল, স্থানীয় সাংগঠনিক ঐক্য এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যেসব নেতা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মসূচি পালন করেছেন, মামলা-হামলা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, তাঁদের অবমূল্যায়ন করা হলে তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে রাজধানীর মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা দায়িত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তার প্রভাব নির্বাচনী কার্যক্রমে পড়তে পারে। কোনো এলাকায় জনপ্রিয় ও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী নেতাকে যথাযথ দায়িত্ব না দিলে সেখানে দলীয় কর্মীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর সুযোগ নিতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তি।

তবে ব্যক্তিগত প্রভাবকে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখাও সমীচীন নয়। দলের স্বার্থে নেতৃত্ব নির্বাচন ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে সততা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, জনসম্পৃক্ততা, নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতা এবং কর্মীদের ঐক্য ধরে রাখার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

নির্বাচনী অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীর আসনগুলো বিএনপির জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ঢাকার আসনগুলোতে জয়-পরাজয় শুধু স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভর করে না; প্রার্থী নির্বাচন, ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক প্রস্তুতি, জোটের হিসাব এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সাম্প্রতিক নির্বাচনে ঢাকার কয়েকটি আসনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পেছনে কী কী কারণ কাজ করেছে, তা নিয়ে বিএনপির নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রার্থী বাছাইয়ে স্থানীয় জনপ্রিয়তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছিল কি না, নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় ছিল কি না, নির্বাচনী প্রচারে দুর্বলতা ছিল কি না এবং ভোটারদের প্রত্যাশা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

কোনো আসনে পরাজয়ের জন্য শুধু একজন নেতা বা একটি সিদ্ধান্তকে দায়ী করলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে। বরং প্রতিটি আসনের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।

রাজধানীর রাজনীতি ধরে রাখতে করণীয়

ঢাকায় বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, রাজধানীর প্রতিটি থানা, ওয়ার্ড ও নির্বাচনী এলাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন—এমন নেতাদের চিহ্নিত করে তাঁদের উপযুক্ত দায়িত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিজ্ঞ ও তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে, যাতে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব সাংগঠনিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে।

তৃতীয়ত, দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি। কে কতটা জনপ্রিয়, কে কতটা সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় এবং কে সংকটের সময় কর্মীদের পাশে ছিলেন—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। চতুর্থত, তৃণমূলের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন উপেক্ষা করে শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করলে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

পাশাপাশি, তরুণ ভোটার, নারী ভোটার, পেশাজীবী এবং নগরজীবনের নানা সমস্যায় জর্জরিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে দলের যোগাযোগ বাড়ানোও প্রয়োজন। শুধু পরিচিত নেতাদের ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি এলাকায় কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে সারা দেশে

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, রাজধানীর রাজনীতিতে কোনো দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি হলে তার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতেও পড়তে পারে। ঢাকাকে ঘিরে গণমাধ্যম, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও জাতীয় পর্যায়ের জনমত গড়ে ওঠার কারণে রাজধানীর নেতৃত্বের কার্যকারিতা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ফলে ঢাকায় নেতৃত্বের ভারসাম্য নষ্ট হলে তা দলের সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এ প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অন্যান্য সাংগঠনিক বাস্তবতার ওপর।

বিএনপির সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজধানীর রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুন করে মূল্যায়ন করা। মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমানউল্লাহ আমান, ইশরাক হোসেনসহ অভিজ্ঞ ও নতুন প্রজন্মের নেতাদের সক্ষমতা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও সুসংহত হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয় নয়, বরং যোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের সমন্বয়কে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। পরীক্ষিত নেতাদের অবমূল্যায়ন করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি নতুন নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করাও দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই কাউকে অযথা কোণঠাসা না করে যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া, অভ্যন্তরীণ বিরোধ কমানো এবং তৃণমূলের আস্থা ধরে রাখাই হওয়া উচিত ঢাকায় বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।