আনন্দদায়ক রেলভ্রমণের প্রথম শর্ত টিকিট। সেই টিকিটের অনলাইন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ২০২২ সালের মার্চ থেকে ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি’র হাতে। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকিটিং ব্যবস্থা নিয়ে সরকারি আইটি অডিটে উঠে এসেছে একাধিক অনিয়ম ও নিরাপত্তাঝুঁকির তথ্য। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেলযাত্রীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য দেশের বাইরে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে টিকিট ব্লক, কালোবাজারি, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন এবং রাজস্ব ঘাটতির মতো বিষয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে।
সরকারের পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকিটিং সিস্টেমের (বিআরআইটিএস) ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কার্যক্রমের ওপর এই আইটি অডিট পরিচালিত হয়। গত ১৬ আগস্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দপ্তরে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়। অডিট প্রতিবেদনে লিড পার্টনার সহজ লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিদেশে ২ কোটি ৮৯ লাখ যাত্রীর তথ্য
অডিটে বলা হয়েছে, কোনো প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই বিআরআইটিএসের মূল ডেটাবেজ ও হোস্টিং দেশের বাইরে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) সিঙ্গাপুর অঞ্চলের ভার্চুয়াল প্রাইভেট ক্লাউডে রাখা হয়েছে। এতে প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ সেবাগ্রহীতার তথ্য দেশের বাইরে সংরক্ষিত রয়েছে।
এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে নাম, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বর, ই-মেইল, ভ্রমণ ইতিহাস এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবেদনশীল তথ্য দেশের বাইরে থাকায় তথ্যের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রেলওয়ে যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্যের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বেড়েছে। রেলওয়ের ই-টিকিটিং সিস্টেমে ব্যবহারকারীর নিবন্ধন যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনের এনআইডি এপিআই ব্যবহৃত হলেও সেটি অরক্ষিত অবস্থায় থাকার বিষয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে।
টিকিট আগেই ব্লকের সুযোগ
অডিটে ই-টিকিটিং সিস্টেমের অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ডের অপব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট উন্মুক্ত করার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই নির্দিষ্টসংখ্যক টিকিট ব্লক করার সুযোগ রয়েছে। ড্যাশবোর্ডের ‘অরেঞ্জ ট্রিপস’ মেনু ব্যবহার করে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এসব টিকিট ব্লক করতে পারেন বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ ঘাটতির কারণে স্টেশনে দায়িত্ব পালনকারী ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও রেলওয়ের বুকিং সহকারীর যোগসাজশে টিকিট কালোবাজারির সুযোগ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজস্ব ঘাটতি ৮ কোটি টাকা
অডিট প্রতিবেদনে অনলাইন টিকিট বিক্রির বিপরীতে সরকারের রাজস্ব ঘাটতির কথাও বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, অনলাইন টিকিটের বিপরীতে প্রাপ্ত ভ্যাট এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া ভ্যাটের মধ্যে ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৯০২ টাকা ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি প্রকৃত আয়ের তুলনায় কম অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ায় সরকারের ৮ কোটি ৫ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ
চুক্তি অনুযায়ী সহজের কর্মীদের দায়িত্ব ছিল সিস্টেমের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ। টিকিট বিক্রি, কোটার সমন্বয়, আসন সংরক্ষণ, টিকিট ব্লক বা রিলিজের মতো কাজে তাদের যুক্ত থাকার সুযোগ ছিল না। অথচ অডিটে প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট সহজের কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিটি অনিয়মের জন্য ভেন্ডরকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান থাকলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো জরিমানা করেনি বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে চুক্তির ১৮ মাস পূর্ণ হওয়ার পরও পাঁচটি বিষয়ে শর্ত পূরণ না হওয়ায় চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে বলেও অডিটে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
সিনেসিস আইটির চিফ সল্যুশন অফিসার মো. আমিনুল বারি শুভ বলেন, অংশীদারদের প্রত্যেকের পৃথক দায়িত্ব ছিল। রেলের টিকিটিং ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত অপারেশনের সঙ্গে সিনেসিস আইটির সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই; এসব কার্যক্রম সহজ ডটকমের দায়িত্বে।
ভিনসেন জেভির পক্ষ থেকে মেহেদি হাসান বলেন, তারা শুধু অর্থ বিনিয়োগ করেছেন এবং চুক্তির পর কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
সহজ ডটকমের চেয়ারম্যান মালিহা এম কাদিরকে অডিট আপত্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এসব কীসের অডিট, তিনি জানেন না। পরে সহজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) আমিনুল হকের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রেলওয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রূপম আনোয়ার বলেন, প্রতিবেদনটি তার কাছে আসেনি; এলে জবাবদিহির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেল ও সড়ক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, বিষয়টি তিনি প্রথমবার জানলেন এবং এমনটি হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, রেলযাত্রীদের এনআইডি তথ্য বিদেশে থাকার বিষয়টি তিনি প্রথম জানলেন। এমনটি হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।