ঢাকা, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৩:০৯:০০ AM

রাসেলের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
06-10-2026 07:19:55 PM
রাসেলের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়ন্ত্রণাধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সম্প্রতি পদোন্নতিপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমস ক্যাডারের ১১ ব্যাচের এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদে দায়িত্ব পালনকালে রাসেল আল মামুন অনিয়মের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ঘুষ গ্রহণ এবং রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগকারীর দাবি।

বন্ড কমিশনারেটে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত কাস্টম বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই সময়ে তিনি প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায় করেছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

বন্ড ব্যবস্থার বিভিন্ন ফাঁকফোকর ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধের নামে প্রিভেন্টিভ টিম নিয়ে রাতের টহল পরিচালনার কথা বলা হলেও, পরবর্তী সময়ে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ব্যবসায়ীদের ছাড় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বন্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন অর্থের পাশাপাশি নিয়মিত মাসিক ‘মাসোহারা’ আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।

সাবেক কমিশনারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি
অভিযোগে আরও বলা হয়, এনবিআরের সাবেক এক সদস্য ও তৎকালীন অবিভক্ত বন্ড কমিশনারের সঙ্গে রাসেল আল মামুনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মোংলা কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনের সময় ওই কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং পরবর্তী সময়ে তিনি ওই কমিশনারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

মোংলা কাস্টমসের মাধ্যমে খালাস হওয়া গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন ভারী আমদানিপণ্যে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরে ওই কমিশনার ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে যোগ দিলে ২০১৮ সালে রাসেল আল মামুনকেও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়ে আসা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে উত্তর বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে গুলশান ও টঙ্গী এলাকার বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো থেকেও বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারীর দাবি, গুলশানের বিভিন্ন ওয়্যারহাউস থেকে মাসে প্রায় এক কোটি টাকা এবং টঙ্গী সার্কেল থেকে আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা আদায় করা হতো।

৩৫ লাখ টাকার অডিট চুক্তির অভিযোগ
সম্প্রতি ‘হোসেন ডাইং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অডিট নিয়ে রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগে বলা হয়েছে, অডিট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তিনি ৩৫ লাখ টাকার গোপন চুক্তি করেন। পরে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ফাইল অনুমোদন করে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে এ বিষয়ে এনবিআরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় এক কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীর দাবি।

কমলাপুর আইসিডিতেও অনিয়মের অভিযোগ
কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনকালেও রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা না দিলে চালান আটকে দেওয়া কিংবা মামলার ভয় দেখানো হতো। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

নামে-বেনামে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ রাসেল আল মামুন রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছেন। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ এবং শত শত শতাংশ জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় প্লট, ফ্ল্যাট ও গাড়ি কেনার পাশাপাশি পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও অন্যান্য আত্মীয়ের নামে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, আয়কর নথিতে প্রদর্শিত সম্পদের তুলনায় তাঁর প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি।

পারিবারিক মামলার অভিযোগ
রাসেল আল মামুনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর স্ত্রীর পক্ষ থেকে নারী নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মামলাটি চলমান রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা এবং রাসেল আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে গণ্য করা আইনগত ও সাংবাদিকতাগতভাবে সমীচীন নয়।