ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৭:৫২:০৫ PM

ঘুষের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে দুই কর্মকর্তা

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
09-10-2026 06:46:57 PM
ঘুষের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে দুই কর্মকর্তা

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য খালাস ও আনস্টাফিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ঘুষ বাণিজ্য, ফাইল আটকে রাখা এবং কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তির সহকারী কমিশনার (এসি) ওমর কাউসার এবং রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের দিকে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিএন্ডএফ কর্মচারীদের দাবি, বিভিন্ন অজুহাতে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে তাঁদের ওপর অনৈতিকভাবে অর্থ দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, চট্টগ্রাম বন্দরের পিসিটিসহ পাঁচটি আনস্টাফিং গেট থেকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি গেট থেকে সপ্তাহে দেড় লাখ টাকা করে আদায় করা হয় বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। তবে অর্থ আদায়ের এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ, আর্থিক লেনদেনের নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

পণ্য খালাসে বিলম্বের অভিযোগ
ভুক্তভোগী সিএন্ডএফ কর্মচারীদের অভিযোগ, বাণিজ্যিক পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার ওমর কাউসারের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে—এমন কথা বলে তাঁদের তাঁর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট গেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পণ্য দেখানোর পরও পুনরায় পরীক্ষার কথা বলে খালাস প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।

অভিযোগকারীদের দাবি, কখনো পরদিন পণ্য পরীক্ষা করার কথা বলা হয়, আবার কখনো বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখা হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাস করা সম্ভব হয় না। ফলে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ডেমারেজ, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। পণ্য আটকে থাকলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই অনেকে অনৈতিক অর্থের দাবির কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।

তাঁদের অভিযোগ, পণ্য খালাসের মতো নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমে অযথা বিলম্ব তৈরি করা হলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বন্দরের কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

সুমন কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
এমবিবি আনস্টাফিং গেটের দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, তিনি নিয়মিত সহকারী কমিশনারের কার্যালয়ে যাতায়াত করেন এবং পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অজুহাতে বিলম্বের ঘটনায় ভূমিকা রাখেন। তবে এ বিষয়ে তাঁর নির্দিষ্ট ভূমিকা কিংবা অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করার মতো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারীর দাবি, পণ্য খালাসে বিলম্ব হলে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অনৈতিক অর্থ দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর। তবে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো নির্দিষ্ট লেনদেন, নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাত পর্যন্ত অপেক্ষা, বাড়ছে ভোগান্তি
ভুক্তভোগী সিএন্ডএফ কর্মচারীদের আরও অভিযোগ, প্রতিবাদ এবং এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পরও তাঁদের হয়রানি কমেনি; বরং ভোগান্তি বেড়েছে। তাঁদের দাবি, সারাদিন অপেক্ষায় রাখার পর রাত ১০টা থেকে ১১টার দিকে পণ্য পরদিন পরীক্ষা করা হবে বলে জানানো হয়। এতে পণ্য খালাসের জন্য পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় এবং অতিরিক্ত ডেমারেজসহ অন্যান্য ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ ধরনের পরিস্থিতিতে পণ্য দ্রুত ছাড় করাতে গিয়ে ব্যবসায়ী ও তাঁদের প্রতিনিধিরা আর্থিক চাপের মুখে পড়েন। তবে এসব ঘটনার তারিখ, সংশ্লিষ্ট ফাইলের নম্বর এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের লিখিত নির্দেশনা যাচাই করা গেলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিএন্ডএফ কর্মচারীরা। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বিলম্ব ও হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে আনস্টাফিং গেটগুলোর অর্থ আদায়ের অভিযোগ, পণ্য পরীক্ষার সময়সূচি, ফাইল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণের দাবিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া নিয়ে এমন অভিযোগ উঠলে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।

সহকারী কমিশনার ওমর কাউসার, রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাস এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না, হলে তার ফলাফল কী এবং কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে—সেসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিষয়টি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।