ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ১১:২৯:০৮ PM

ইউপিএলে এসে কিছু ব্যক্তির আক্রমণাত্মক আচরণ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
29-09-2026 03:30:05 PM
ইউপিএলে এসে কিছু ব্যক্তির আক্রমণাত্মক আচরণ

ইউপিএল-প্রকাশিত একটি বইকে ঘিরে সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এর বিকেল ৫:৩০-এর দিকে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। ইউপিএল-এর বাংলাবাজার শোরুমে এসে কিছু ব্যক্তি আক্রমণাত্মক আচরণ করে, “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”কে নিষিদ্ধ বই হিসেবে দাবি করে এর বিপণন বন্ধ করার দাবি জানায়। দোকানের শাটার লাগিয়ে দিয়ে আমাদের দুইজন বিক্রয়কর্মীকে প্রবল হয়রানি করা হয়। তাদেরকে এক পর্যায়ে ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটক করে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমাদের পক্ষ থেকে প্রশ্নকারীদের জানানো হয়েছে যে, বইটি নিষিদ্ধ নয়। ইউপিএল তার প্রকাশিত প্রতিটি বইকে ধারণ করে। কোনো বইকে নিষিদ্ধ করতে হলে একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সকলকে অবগত করতে হয়, কিছু আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়। এই বইয়ের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। সরকার বা আদালতের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিলে ইউপিএল সেই অনুযায়ী যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
ঘটনাটি আমাদের জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর এবং দুর্ভাগ্যজনক বলে আমরা মনে করি। আমরা প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনো চাপের সম্মুখীন হয়েছি। সরকার কিংবা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো কোনো বই নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডেকেট সভা থেকে ইউপিএল-প্রকাশিত একটি বইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয়েছিল। একই আমলে মওদুদ আহমেদের গ্রন্থাবলি নিয়ে বহুবার ইউপিএলকে চাপের মুখে পড়তে হয়েছে, অধ্যাপক আসিফ নজরুলের গঙ্গাচুক্তি বিষয়ক গ্রন্থটিও পর্যালোচকদের মতামতের ভিত্তিতে অত্যন্ত প্রতিকূল সময়ে আমরা প্রকাশ করেছি। কিছু পাণ্ডুলিপি প্রকাশে ইউপিএল অসম্মতি জানালে তাদেরকে সরকারি হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। প্রকাশক হিসেবে আমরা যথাসম্ভব এই চাপগুলো উপেক্ষা করেছি। পেশাদারত্বের এই নীতির কারণে ইউপিএল বহুবার বাণিজ্যিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু কখনোই প্রকাশনার মৌলিক মানদণ্ড থেকে সরে আসেনি। আমাদের প্রকাশিত যে কোনো গ্রন্থ সম্পর্কে এটিই আমাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।
যে কোনো গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে ইউপিএল নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড অনুসরণ করে। আমাদের পাণ্ডুলিপির পর্যালোচকগণ স্বাধীনভাবে প্রতিটি বই যাচাই করেন, তাদের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতেই ইউপিএল প্রতিটি বই প্রকাশ করে। এই আত্মবিশ্বাসই আমাদের আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি, যার শক্তিতে কোনো চাপের মুখেই ইউপিএল কখনো কোনো বই সরিয়ে নেয় না। বিগত আমলের মতো এখনও “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”র বিজ্ঞাপন ইউপিএল-এর পেজে প্রকাশিত হয়। কিছুদিন আগে আমরা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক রচিত জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস বিষয়ক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছি। এই বইটিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আছে বলে আমাদের বিশেষজ্ঞ পর্যালোচকগণ যে মতামত দিয়েছেন, তার প্রেক্ষিতেই আমরা বইটি প্রকাশ করেছি। প্রকাশক হিসেবে এটিই পেশাদারত্বের নীতি। আমরা মনে করি, এই নৈতিক অবস্থান থেকে সরে গেলে একাডেমিক প্রকাশনায় যুক্ত থাকার কোনো অর্থ হয় না, যে একাডেমিক প্রকাশনার ধারাটির সূচনা বাংলাদেশে ইউপিএল-এর হাত ধরেই হয়েছিল।
আমরা মনে করি, “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” বাংলাদেশের ইতিহাসের পরিক্রমায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই, বাংলাদেশ সৃষ্টির ও মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের বহু প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। ইউপিএল তার প্রতিটি বই দায়িত্ব নিয়েই প্রকাশ করে। এই বইটি কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যথানিয়মতে নিষিদ্ধ করলে ইউপিএল যথাযথ আইন অনুসারে কাজ করবে। 
তবে আমরা প্রকাশক হিসেবে, এবং বিশেষত একাডেমিক প্রকাশক হিসেবে মনে করি, কোনো ফৌজদারী অপরাধের উস্কানি নেই, এমন বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনে হস্তক্ষেপ করাটা জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির সার্বিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। বিগত আমলেও আদর্শ প্রকাশনীর তিনটি বইকে আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ না করেই বইমেলাতে তাদের স্টল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইউপিএল এই পেশাদার অবস্থান থেকেই প্রতিবাদ করেছিল। এখনও ইউপিএল-এর অবস্থান একই রকম দৃঢ় ও অবিচল থাকবে। আমরা মনে করি রাষ্ট্র ও সমাজের বিকাশের স্বার্থেই সরকারের ও সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব হবে মুক্তচিন্তা ও বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার এই পরিসরে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা এবং অনুরূপ হস্তক্ষেপ প্রতিহত করা।
প্রকাশনার মতো জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম আইনসম্মত নয় এমন চাপ বা হুমকির মুখে থাকলে তাতে দেশের সামগ্রিক সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা আশা করবো, সর্বস্তরের লেখক, পাঠক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সহপ্রকাশক, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারের বিবেচক অংশ এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকল মানুষ একাডেমিক প্রকাশনার ওপর এই আঘাতের সময়ে আমাদের পাশে দাঁড়াবেন। একই সঙ্গে প্রকাশনা শিল্পে গুণ্ডামির রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার বিপদ সকলে উপলব্ধি করবেন এবং এমন যে কোনো অবৈধ তৎপরতাকে রাষ্ট্র, সমাজ ও জ্ঞানচর্চার স্বার্থে কঠোর হাতে দমন করবেন।