প্রায় ৫ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার ঢাকা ও পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিড সঞ্চালন প্রকল্পে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন, আর্থিক অনিয়ম, তদারকির ঘাটতি এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারদর যাচাই ও দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়াই সাতটি আন্তর্জাতিক প্যাকেজের আওতায় ২ হাজার ২১৪ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকার চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পে জনবল সংকট, কাজের ধীরগতি, অডিট আপত্তি এবং কারিগরি ঝুঁকির বিষয়ও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
সরকারি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর)-২০০৮ অনুযায়ী, কোনো দরপত্র আহ্বানের আগে বাজারদর যাচাই করে দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পে সেই বিধান অনুসরণ করা হয়নি। ফলে প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে কাজ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তি সম্পাদন সরকারি ক্রয়বিধির সরাসরি লঙ্ঘন এবং এতে সরকারি অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি বেড়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৫ হাজার ৯৪৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ঋণ দিচ্ছে ৪ হাজার ২১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং পিজিসিবি নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করছে ৩২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
প্রতিবেদনে প্রকল্পের অন্যতম বড় আর্থিক ক্ষতির উদাহরণ হিসেবে প্যাকেজ-৮-এর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ৫২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকার এ প্যাকেজে এনার্জিপ্যাক-সিএসইপিডিআই কনসোর্টিয়াম নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় পিজিসিবি চুক্তি বাতিল করে। পরে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করলে একই কাজের ব্যয় ১০৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৭১ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় পৌঁছায়। ফলে শুধু এই একটি প্যাকেজেই সরকারের অতিরিক্ত ৫৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এ প্যাকেজের কাজ বিলম্বিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্যাকেজ-৪-এর আওতায় নির্মিত সঞ্চালন লাইনও চালু করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন সঞ্চালন লাইন চার্জ না করে ফেলে রাখলে সরঞ্জামের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারিগরি মান নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন সরঞ্জাম ব্যবহারের আগে বাধ্যতামূলক ফ্যাক্টরি একসেপ্টেন্স টেস্ট (এফএটি) না করেই ঠিকাদারকে ৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আইএমইডির মতে, পরীক্ষা ছাড়া সংবেদনশীল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে যান্ত্রিক ত্রুটি, অগ্নিকাণ্ড কিংবা জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ট্রান্সফরমার অয়েলের মান পরীক্ষা ছাড়াই আমদানি ও বিল পরিশোধের মাধ্যমে আরও ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকার অনিয়মের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রকল্পে আরও বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অসঙ্গতি চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। অনুমোদন ছাড়া ড্রোন কেনায় ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী ড্রোন নিবন্ধন ও উড্ডয়ন অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও তা নিশ্চিত না করেই এসব ড্রোন কেনা হয়, ফলে সেগুলোর ব্যবহার আইনি জটিলতায় পড়েছে। এছাড়া চুক্তিতে নির্ধারিত পরিমাণের অতিরিক্ত মালামাল আমদানির মাধ্যমে আরও ৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ২৫টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ২ হাজার ৫৩৮ কোটিরও বেশি। এর মধ্যে ১২টি গুরুতর আপত্তি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। বাস্তব ব্যয় এবং লোন ফাইন্যান্সিয়াল ইনফরমেশন সিস্টেমে প্রদর্শিত ব্যয়ের মধ্যে ৮৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় নথি ছাড়াই ৫৬ কোটি ৯১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা ছাড়, সরকারি কোষাগারে ৩৮ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা সুদ জমা না দেওয়া, বরাদ্দের চেয়ে ২৫ কোটি ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয়, ভ্যারিয়েশন অর্ডার ছাড়া ২০ কোটি ৪২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয় এবং ভূমি অধিগ্রহণে সমন্বয়হীনভাবে ১৩ কোটি ৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে জনবল সংকটকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। অনুমোদিত ৮৭টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৫২টি শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের প্রায় ৫৯ শতাংশ পদ খালি থাকায় মাঠপর্যায়ে তদারকি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্পের অগ্রগতিও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে, যা মূল সময়সীমার তুলনায় ৭৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেশি। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল ৭৮ শতাংশ, কিন্তু অর্জিত হয়েছে মাত্র ৬১ দশমিক ২৫ শতাংশ। একই সময়ে মোট বরাদ্দের মাত্র ৫৫ দশমিক ২৪ শতাংশ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে।
প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়ন করছে দেশি-বিদেশি একাধিক প্রতিষ্ঠান। রামপুরা-বসুন্ধরা আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল লাইনের কাজ করছে চীনের টিবিইএ। সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করছে ভারতের লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো এবং ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেড। বাতিল হওয়া এনার্জিপ্যাক-সিএসইপিডিআই কনসোর্টিয়ামের কাজ পুনরায় দরপত্রের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদারকে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এছাড়া নীলফামারীর ডোমার উপকেন্দ্রের জমি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মামলার কারণে ভূমি হস্তান্তর বিলম্বিত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ‘রাইট অব ওয়ে’ জটিলতায় সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কয়েকটি উপকেন্দ্রের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও বালু ব্যবহারের প্রমাণও পেয়েছে আইএমইডি। প্রকল্প শুরুর পর এ পর্যন্ত চারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হওয়ায় ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে আইএমইডি ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তি ও কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া বিল পরিশোধের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ১২টি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সরকারি ক্রয় ও আর্থিক বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ফয়জুল কবির বলেন, “এ ধরনের কিছু হয়নি।” তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশিদ খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।