পরীক্ষাসংক্রান্ত অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে জবাবদিহি এবং শিক্ষা খাতে সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ভারতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পাশাপাশি সরকারের কাছে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। পরবর্তীতে বিক্ষোভের একটি অংশ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিও তোলা হয়।
দিল্লি থেকে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীরা অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। বুধবার সেখানে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
আন্দোলনের মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন,
"ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা যন্তর মন্তর ছাড়ব না।"
তিনি আরও বলেন,
"যে দেশে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছিল, যে দেশে সরকারের সমালোচনাকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে দেখা হতো, আমরা সেই দেশকে আবার প্রশ্ন করতে শিখিয়েছি।"
বিরোধী দলের সমর্থন
মূলত তরুণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার পর আরও জোরদার হয়। বিরোধী দলগুলোও শিক্ষা খাতে অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের বলপ্রয়োগের সমালোচনা করে সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করেন। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবও বলেন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের নীরবতা উদ্বেগজনক।
আন্দোলনের পটভূমি
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন জাতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনার কারণে লাখো পরীক্ষার্থী পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য হন। এছাড়া উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের একটি পরীক্ষার অনলাইন মূল্যায়ন নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
এই ঘটনাগুলোর প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। পরবর্তীতে আন্দোলনের দাবির পরিধি বেকারত্ব, কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয়েও বিস্তৃত হয়।
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
সোমবার সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। পরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তোলে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে জানায়, দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রয়োজনীয়তা, বৈধতা ও আনুপাতিকতার মানদণ্ড পূরণ করেছে কি না, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য
যন্তর মন্তরে অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের একজন বলেন, এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের তরুণরা প্রথমবারের মতো নিজেদের কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন।
২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কাব্য এএফপিকে বলেন,
"আমি ভয় পেয়েছি। সোমবার আমি নিজের চোখে পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের মারধর করতে দেখেছি। কিন্তু আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই।"
সরকারের অবস্থান
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, সরকার শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে এবং বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন,
"শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের জবাবদিহি, সংস্কার এবং কার্যকর সমাধান দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে।"
তিনি আরও লেখেন,
"তারা বিশৃঙ্খলার চেয়ে নিশ্চয়তা, স্লোগানের চেয়ে সমাধান এবং বিঘ্নের চেয়ে দায়িত্বশীলতা পাওয়ার যোগ্য।"
এদিকে দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও গোয়াসহ দেশের বিভিন্ন শহরেও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের খবর পাওয়া গেছে।
সূত্র: এএফপি