ঢাকা, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
সময়: ০৩:২২:৪১ PM

প্রেমের সম্পর্কের আড়ালে কোটি টাকার প্রতারণা

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
10-06-2026 03:22:41 PM
প্রেমের সম্পর্কের আড়ালে কোটি টাকার প্রতারণা

ঢাকার আদালতে প্রেমের সম্পর্ক, বিয়ের প্রতিশ্রুতি এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মামলার বিশেষ দিক হলো, বাদী ও আসামি—উভয়েই দেশের প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা (ক্যাডার কর্মকর্তা)। এই ঘটনায় প্রশাসনিক অঙ্গনসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. সোহেলউদ্দিন প্রিন্সের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬ (অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ) ও ৪২০ (প্রতারণা) ধারায় অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হলো।

মামলার বাদী মোসা. তানজিনা সাথী বর্তমানে সহকারী কর কমিশনার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, ২০১৭ সালে ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সহকর্মী ক্যাডার কর্মকর্তা সোহেলউদ্দিন প্রিন্সের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে সোহেলউদ্দিন তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক স্থাপন করেন।

বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের আশ্বাস ও পারিবারিক বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা প্রয়োজন ও অজুহাত দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেন সোহেলউদ্দিন প্রিন্স। ধাপে ধাপে নেওয়া সেই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৩২ লাখ ১১ হাজার টাকা। তবে পরবর্তীতে তিনি বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান এবং নেওয়া অর্থও ফেরত দেননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও অর্থ ফেরত না পেয়ে এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন তানজিনা সাথী। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে তদন্তের দায়িত্ব দেয় অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)।

তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর সিআইডি বিভিন্ন নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য সংগ্রহ করে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালায়। তদন্ত শেষে সংস্থাটি আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে আসামির বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিকভাবে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (৯ জুন) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার ইভার আদালতে মামলাটির শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিকালে আসামি সোহেলউদ্দিন প্রিন্স আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় আসামিপক্ষ মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করলেও আদালত তা নাকচ করে দেন। পরে আদালত দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ গঠন করে বিচার কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশ দেন।

আদালত আগামী ১ জুলাই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছেন। ওই দিন থেকে মামলার সাক্ষ্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। বিচার শেষে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।

এদিকে আদালত সূত্রে জানা গেছে, সোহেলউদ্দিন প্রিন্সের বিরুদ্ধে তাঁর স্ত্রীর দায়ের করা একটি যৌতুক মামলাও বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। ফলে একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত অবস্থান নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখানে উভয় পক্ষই উচ্চশিক্ষিত এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা। ফলে ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিরোধ নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাস, আর্থিক লেনদেন এবং প্রতারণার অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর আইনি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি সরকারি কর্মকর্তা হলেই তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আদালতের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করার নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারণার অভিযোগও সামনে আসছে। তাই ব্যক্তিগত সম্পর্ক যতই গভীর হোক না কেন, বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে লিখিত দলিল, ব্যাংকিং নথি ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে প্রেমের সম্পর্ক, বিয়ের প্রতিশ্রুতি এবং ২ কোটি ৩২ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া এই মামলাটি এখন বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগ পর্যন্ত মামলার অভিযোগগুলো বিচারাধীন বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হবে। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়-দায়িত্ব। দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা বজায় রাখতে এ ধরনের আলোচিত মামলার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।