ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬,
সময়: ১১:৫৭:৪৯ PM

খুলনায় বেপরোয়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠী

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
09-06-2026 11:57:49 PM
খুলনায় বেপরোয়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠী

এক সময়ের শান্তির নগরী হিসেবে পরিচিত খুলনা আবারও ভয়াবহ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের নগরীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার দুই দশকের বেশি সময় পর নতুন করে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান এবং ধারাবাহিক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নগরবাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পাঁচ দশক আগে ‘রামদা বাহিনী’ গঠন করে খুলনা মহানগরীতে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদার। রেললাইনের পাত চুরি ও বরফকল দখলের মাধ্যমে তার অপরাধ জগতের সূচনা হলেও পরে তিনি খুলনার অপরাধ সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রকে পরিণত হন। খুন, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন নগরবাসীর মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করেছিলেন। অবশেষে গ্রেপ্তার, বিচার এবং ২০০৪ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়ে তার অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

তবে এরশাদ শিকদারের পতনের পরও খুলনায় সন্ত্রাস পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় ছিল। নব্বইয়ের দশকে দৌলতপুর, খালিশপুর, বাস্তুহারা ও মুজগুন্নী এলাকায় নানা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। যৌথবাহিনীর অভিযান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং ক্রসফায়ারের ঘটনায় অনেক সন্ত্রাসী গ্রুপ দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেকে গ্রেপ্তার হন, কেউ নিহত হন এবং কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খুলনায় সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, মোটরসাইকেল শোডাউন, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে খুলনার সন্ত্রাস জগত নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ১০টি প্রভাবশালী সন্ত্রাসী গ্রুপ। এর মধ্যে রয়েছে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, রোহান-পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, ট্যাংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নবাব গ্রুপ এবং নাসির গ্রুপ। অন্যদিকে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) হালনাগাদ তালিকায় ১৮১ জন সন্ত্রাসীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গত দুই বছরে খুলনা অঞ্চলে শতাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও খুন, সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, চুরি কিংবা ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যকে এসব ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করেছে। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি সাবেক কাউন্সিলর গোলাম রাব্বানী টিপু কক্সবাজারে হত্যার শিকার হন। একই বছরের ৩০ নভেম্বর খুলনা আদালত প্রাঙ্গণের প্রধান ফটকের সামনে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজন নামে দুই যুবককে। পুলিশি সূত্রের দাবি, এই হত্যাকাণ্ড ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিশোধের অংশ।

আদালত প্রাঙ্গণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড নগরবাসীকে বিস্মিত ও আতঙ্কিত করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এরপর চলতি বছরের ৪ মার্চ ডাকবাংলো মোড়ে ঈদের কেনাকাটার সময় শ্রমিক দল নেতা মাসুম বিল্লাহকে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় তিনটি পৃথক ‘কিলার গ্রুপ’ অংশ নেয়। একটি দল গুলি চালায়, অন্যটি ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে এবং তৃতীয় দলটি হামলাকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। এ ঘটনা সন্ত্রাসীদের সংগঠিত শক্তি ও পরিকল্পিত অপরাধ কর্মকাণ্ডের চিত্র স্পষ্ট করে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মহানগরীতে অন্তত ১৬টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি ঘটনায় মামলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ করে সহজে পার পেয়ে যাওয়া, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, মাদক বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয় এবং কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছে, অপরাধ দমনে তারা সক্রিয় রয়েছে। কেএমপির উপ-কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া জানিয়েছেন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও কিশোর গ্যাং দমনে নিয়মিত চেকপোস্ট, বিশেষ অভিযান ও চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি পরিচালিত বিশেষ অভিযানে গ্রেনেড বাবুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী কসাই লিটন, রিফাত এবং বি কোম্পানির সদস্য সজল আকনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে উঠে এসেছে যে তারা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিল।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই বক্তব্যে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। তাদের অভিযোগ, অপরাধীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালালেও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে অপরাধীদের মধ্যে ভয়ভীতি কমে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেছেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে এনেছেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেছেন, বর্তমানে খুলনায় যেভাবে প্রকাশ্যে খুন, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ছে, তা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। আদালত চত্বরে পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একসময় কুখ্যাত এরশাদ শিকদারের সন্ত্রাসী রাজত্বের সময়ও খুলনায় এত ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ঘটেনি, যতটা এখন দেখা যাচ্ছে। তার মতে, বর্তমানে খুলনায় একাধিক ‘নয়া এরশাদ শিকদার’-এর উত্থান ঘটেছে, যারা বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খুলনায় সন্ত্রাস ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দ্রুত বিচার, মাদক নিয়ন্ত্রণ, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় এক সময়ের শান্ত ও সম্ভাবনাময় এই নগরী আবারও ভয় ও সন্ত্রাসের নগরীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।