ঢাকা, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:২৯:২১ PM

লক্ষীপুরের চার হত্যার,উপন্যাস”শেষ আলো

মান্নান মারুফ
27-06-2026 12:27:55 PM
লক্ষীপুরের চার হত্যার,উপন্যাস”শেষ আলো

পর্ব-৯ 
ভোরের আলো আজ অনেক দিন পর রিফাতের চোখে একটু অন্যরকম লাগছিল।

সূর্যের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের মেঝেতে পড়েছে। সেই আলো একসময় মুনার আঁকার খাতার ওপর পড়ত। রিমি বই খুলে বসত। নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মুখস্থ করত কবিতা। আর মা রান্নাঘর থেকে ডাক দিতেন—

"সবাই উঠে পড়ো, সকাল হয়ে গেছে।"

আজও সকাল হয়েছে।

কিন্তু সেই ডাক আর নেই।

নীরবতারও একটা গন্ধ আছে। বহুদিন ধরে এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি জানালা, প্রতিটি দরজা সেই নীরবতার গন্ধে ভরে গেছে।

রিফাত ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

আজ তার ঘুম ভাঙেনি।

বরং স্মৃতিগুলোই তাকে জাগিয়ে তুলেছে।

গত রাতের সেই টিনের বাক্সটি আবার সামনে এনে বসওল সে।

বাক্সটার ভেতরে পুরোনো কাগজ, কিছু রসিদ, বাবার একটি বিবর্ণ ছবি, মায়ের বিয়ের সময়কার একটি সাদা-কালো ছবি আর নিচে ভাঁজ করে রাখা একটি নীল কাপড়ে মোড়ানো ডায়েরি।

ডায়েরিটি সে আগেও দেখেছিল।

কিন্তু আজ তার নিচে আরেকটি খাম দেখতে পেল।

হলদেটে হয়ে যাওয়া খাম।

উপরে কাঁপা হাতে লেখা—

"আমার সন্তানদের জন্য"

রিফাতের বুক ধড়ফড় করে উঠল।

এটা কি মা লিখেছিলেন?

তার হাত কাঁপছিল।

অনেকক্ষণ সে খামটি খুলতে পারল না।

মনে হচ্ছিল, খামটা খুললেই আবার মায়ের কণ্ঠ শুনতে পাবে।

অবশেষে ধীরে ধীরে কাগজটি বের করল।

চিঠির শুরুতে লেখা—

"বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।"

তারপর—

"আমার সোনা রিফাত, রিমি, নীলা আর মুনা..."

শব্দগুলো পড়তেই রিফাতের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

সে গভীর শ্বাস নিয়ে আবার পড়তে শুরু করল।

"তোদের জন্য এই চিঠি লিখছি, কারণ জীবন কখন কোন দিকে মোড় নেয়, কেউ জানে না। আমি চাই না, আমার কোনো কথা তোদের কাছে না বলা থেকে যাক।"

"তোদের বাবা চলে যাওয়ার পর অনেকেই বলেছিল, এই সংসার আর চলবে না। কিন্তু আমি জানতাম, আমার চারটি সন্তানই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। তোদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি প্রতিদিন নতুন করে বাঁচতে শিখেছি।"

রিফাতের চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ল।

চিঠিতে মা লিখেছেন—

"রিফাত, তুই সংসারের একমাত্র ছেলে। কিন্তু মনে রাখিস, বড় হওয়া মানে শুধু দায়িত্ব নেওয়া নয়, ভালো মানুষ হওয়াও। রাগকে কখনও নিজের ওপর বসতে দিবি না। মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখবি।"

"রিমি, তুই সবসময় নিজের চেয়ে অন্যের কথা আগে ভাবিস। এই স্বভাবটা কখনও হারাবি না।"

"নীলা, তোর বইয়ের প্রতি যে ভালোবাসা, সেটা ধরে রাখিস। জ্ঞান মানুষকে বড় করে।"

"আর আমার ছোট্ট মুনা, তুই যদি এই চিঠি পড়তে পারিস, তাহলে বুঝব তুই বড় হয়ে গেছিস। আমার জন্য কাঁদিস না। হাসিমুখে মানুষকে ভালোবাসিস।"

রিফাত আর পড়তে পারছিল না।

প্রতিটি শব্দ যেন তার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধছিল।

কিছুক্ষণ পর সে আবার পড়তে শুরু করল।

চিঠির শেষ অংশে বড় অক্ষরে লেখা—

"তোমরা মানুষ হইও, এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।"

আরও নিচে—

"টাকা-পয়সা রেখে যেতে পারব না। বড় বাড়িও বানিয়ে দিতে পারলাম না। কিন্তু যদি তোরা মানুষ হতে পারিস, তাহলে আমার জীবন সার্থক হবে।"

"কখনও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিস না। কিন্তু ঘৃণাকে নিজের হৃদয়ে জায়গা দিবি না। কারণ ঘৃণা মানুষকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে মেরে ফেলে।"

"আর যদি কোনোদিন আমি তোদের সঙ্গে না থাকি, তাহলে মনে রাখিস—আমি সবসময় তোদের দোয়া করে গেছি।"

চিঠির নিচে শুধু একটি শব্দ—

"— মা"

রিফাত চিঠিটা বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগল।

এমন কান্না সে আগে কখনও কাঁদেনি।

মনে হচ্ছিল, এতদিন জমে থাকা সব ব্যথা একসঙ্গে বেরিয়ে আসছে।

সে মাটিতে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল—

"মা...

তুমি কেন আগে থেকে এমন কথা লিখেছিলে?

তুমি কি বুঝতে পেরেছিলে, একদিন আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?"

কেউ উত্তর দিল না।

শুধু জানালার বাইরে বাতাস বইছিল।

চিঠির ভাঁজে একটি ছোট্ট শুকনো শিউলি ফুল ছিল।

হয়তো কোনো এক শরতের সকালে মা রেখে দিয়েছিলেন।

রিফাত ফুলটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ তার মনে পড়ল—

মা বলতেন,

"ফুল ঝরে যায়, কিন্তু তার গন্ধটা থেকে যায়।"

ঠিক তেমনি মানুষও একদিন চলে যায়।

কিন্তু তার ভালোবাসা থেকে যায়।

সন্ধ্যায় রিফাত চারটি কবরের পাশে গেল।

হাতে মায়ের চিঠি।

মাটির ওপর আলতো করে হাত রাখল।

ধীরে ধীরে বলল—

"মা...

তুমি বলেছিলে মানুষ হতে।

আমি চেষ্টা করব।

তোমাদের স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেব না।"

তারপর একে একে তিন বোনের কবরের পাশে দাঁড়াল।

"রিমি আপু...

তোর ছাত্ররা তোকে আজও খুঁজছে।"

"নীলা...

তোর অসমাপ্ত অঙ্ক আমি শেষ করতে পারব না, কিন্তু তোর স্বপ্নটা শেষ হতে দেব না।"

"মুনা...

তোর আঁকা বাড়িটা আমি একদিন সত্যি বানাব।"

বাতাসে শুকনো পাতা উড়ে গেল।

রিফাতের মনে হলো, যেন খুব পরিচিত চারটি হাসি দূর থেকে তাকে আশীর্বাদ করছে।

রাত গভীর।

সে আবার মায়ের চিঠিটি পড়ল।

প্রতিটি লাইন যেন তাকে নতুন করে বাঁচতে শিখাচ্ছে।

সে বুঝতে পারল—

শোক মানুষকে ভেঙেও দেয়, আবার গড়েও তোলে।

আজ যদি সে শুধু কান্নায় ডুবে থাকে, তাহলে মায়ের স্বপ্নের প্রতি অবিচার হবে।

মা তাকে ভেঙে পড়তে শেখাননি।

লড়তে শিখিয়েছেন।

পরদিন সকালে বহুদিন পর সে নিজের কলেজ ব্যাগটি বের করল।

ব্যাগের ভেতরে এখনও পুরোনো খাতা, কলম, পরিচয়পত্র।

ধুলো ঝেড়ে নিল।

মনে হলো, এ যেন শুধু একটি ব্যাগ নয়।

এটা তার অসমাপ্ত জীবনের দরজা।

সে আলমারি থেকে কলেজের সাদা শার্টটি বের করল।

ইস্ত্রি করা নেই।

তবুও যত্ন করে ভাঁজ করল।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেক দিন পর নিজেকে দেখল।

চোখের নিচে কালি।

মুখে ক্লান্তি।

কিন্তু চোখের ভেতর আজ একফোঁটা দৃঢ়তা জন্ম নিয়েছে।

সকালে সে একটি সাদা কাগজ বের করল।

কলম হাতে নিল।

অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তারপর লিখতে শুরু করল—

"বরাবর,
অধ্যক্ষ মহোদয়..."

প্রতিটি শব্দ লিখতে লিখতে তার মনে হচ্ছিল, মা ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন।

হয়তো মৃদু হেসে বলছেন—

"এগিয়ে যা বাবা।"

চিঠি লেখা শেষ করে রিফাত সেটি ভাঁজ করল।

গভীর শ্বাস নিল।

দরজার দিকে তাকাল।

তার জীবনের নতুন পথ আজ শুরু হতে চলেছে।

হাতে কলেজে ফিরে যাওয়ার আবেদনপত্র।

আর বুকের ভেতর মায়ের শেষ চিঠির প্রতিটি শব্দ—

"তোমরা মানুষ হইও..."

চলবে...