ঢাকা, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:৩৯:২১ PM

আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে টেন্ডারে অনিয়ম

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
29-06-2026 12:53:10 PM
আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে টেন্ডারে অনিয়ম

চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্র মূল্যায়নে যোগসাজশ করেছে। একই সঙ্গে কার্যাদেশের আওতাধীন সব পণ্য সরবরাহের আগেই সরকারি বিল পরিশোধের অভিযোগও উঠেছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১৪টি পৃথক আইটেমে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনার জন্য গত জানুয়ারিতে দরপত্র আহ্বান করে। পরবর্তী সময়ে ১৫ এপ্রিল, ৬ মে, ৭ মে, ১৭ মে ও ১৯ মে ধাপে ধাপে মোট ৯ কোটি ২১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৬৬ টাকার চুক্তি সম্পন্ন হয়।

এর মধ্যে ‘এমএসএম হেলথ কেয়ার’ ও ‘এমএসএম বাংলাদেশ’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান একাই ৭ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৬ টাকার ছয়টি কার্যাদেশ লাভ করে। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক রুমানা সুলতানা মৌ।

টেন্ডার মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, টেন্ডার মূল্যায়নে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণা করে এমএসএম বাংলাদেশ ও এমএসএম হেলথ কেয়ারকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক ঠিকাদার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

অভিযোগে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. একরাম হোসেন, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন খালেদ এবং স্টোরকিপার শহীদুল আলমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি একজন ড্যাব নেতাসহ একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কল রেকর্ড যাচাই করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

মেসার্স জম জম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. দিদারুল আলম বলেন, তিনি দরপত্রে অংশ নিয়েও কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই নন-রেসপনসিভ ঘোষিত হয়েছেন। লিখিতভাবে কারণ জানতে চাইলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দেয়নি। তার অভিযোগ, নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতেই নতুন নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে এবং যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মেসার্স এম রহমান অ্যান্ড কোং-এর মো. নাছির উদ্দিন চৌধুরী, মেসার্স সাদমান এন্টারপ্রাইজের সৈয়দ আবু তালেব এবং মেসার্স কাশেম অ্যান্ড ব্রাদার্সের এম এ কাশেম।

একই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত

জাগো নিউজের হাতে আসা নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি সরবরাহের (টেন্ডার আইডি-১২০৬০৭২) ক্ষেত্রে এমএসএম হেলথ কেয়ার দুই কোটি পাঁচ লাখ ৮৭ হাজার ৮৭৬ টাকার কার্যাদেশ পায়।

ওই টেন্ডারে অংশ নেওয়া আলী অ্যাসোসিয়েটসকে নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করা হলেও, একই প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে আসবাবপত্র সরবরাহের (টেন্ডার আইডি-১২০৬০৭৩) টেন্ডারে ২৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৫৯ টাকার কার্যাদেশ লাভ করে। ফলে একই নথিপত্র এক টেন্ডারে অযোগ্য এবং অন্য টেন্ডারে যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।

এ ছাড়া সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি সরবরাহের ক্ষেত্রে মেসার্স আলমগীর অ্যান্ড ব্রাদার্স এক কোটি ৮৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯২ টাকার সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব দিয়েও কার্যাদেশ পায়নি। বরং প্রায় ১৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বেশি দামে এমএসএম হেলথ কেয়ারকে কাজ দেওয়া হয়।

পণ্য সরবরাহের আগেই বিল পরিশোধের অভিযোগ

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সরকারি বিল পরিশোধ নিয়ে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সব ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বুঝে পেয়েছে—এমন প্রত্যয়ন দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে বিল পাঠায়। গত ২২ জুন বিল অনুমোদনের পর আইবাস (ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম)-এর মাধ্যমে ঠিকাদারদের হিসাবে অর্থ ছাড় করা হয়।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, বিল অনুমোদনের পরদিন ২৩ জুনও এমএসএম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের একটি পিকআপ ভ্যানে করে হাসপাতালের স্টোরে ওষুধ সরবরাহ করা হয়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের এক কর্মকর্তা জানান, ওই দিনই ঢাকা থেকে আনা ওষুধ হাসপাতালে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া জাগো নিউজের হাতে থাকা ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ১৬, ১৮ ও ২০ জুন তারিখের তিনটি ডেলিভারি চালানে ২৩ জুন হাসপাতালের স্টোরকিপারের গ্রহণসংক্রান্ত স্বাক্ষর পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগকারীদের দাবি, সম্পূর্ণ পণ্য সরবরাহের আগেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য

এমএসএম হেলথ কেয়ার ও এমএসএম বাংলাদেশের কর্ণধার রুমানা সুলতানা মৌ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠান সব পণ্য ১৪ জুনের মধ্যেই হাসপাতালে সরবরাহ করেছে। কেবল ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের একটি ভ্যাকসিন লেবেলিং-সংক্রান্ত কারণে পরে সরবরাহ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আইবাসে বিল জমা হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অর্থ ছাড় হয়েছে। টেন্ডারে কোনো অনিয়ম হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা

স্টোরকিপার শহীদুল আলম প্রথমে সাংবাদিকের ফোন রিসিভ করলেও পরে আর যোগাযোগ করেননি।

তবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. একরাম হোসেন বলেন, টেন্ডার মূল্যায়ন একটি কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কাজ দেওয়ার সুযোগ তার নেই।

পণ্য সরবরাহ নিয়ে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, সব মালামাল স্টোরে পৌঁছেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে একটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ম্যানুয়ালি টেন্ডার করার জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন চাওয়া হয়ে থাকে।

সুশাসনকর্মীদের উদ্বেগ

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের কেনাকাটায় অতীতেও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। এ সংক্রান্ত মামলায় একজন সিভিল সার্জন কারাভোগও করেছেন।

তার মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ সত্য হলে এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবস্থান

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বি জানান, টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে তাদের কাছে এসেছে। তবে তদন্তের দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এবং এ বিষয়ে এখনো বিভাগীয় পর্যায়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের হাসপাতাল অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপসংহার

চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের কোটি টাকার ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগ সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে দরপত্র মূল্যায়নে বৈষম্যের অভিযোগ, অন্যদিকে পণ্য সম্পূর্ণ সরবরাহের আগেই বিল পরিশোধের দাবি—উভয় বিষয়ই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। এখন তদন্তের ফলাফল এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরই নির্ভর করছে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা।