ঢাকা, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
সময়: ০৫:৩৫:৫৮ PM

দেশে হাম ও ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তে উদ্বেগ

মান্নান মারুফ
27-06-2026 04:08:10 PM
দেশে হাম ও ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তে উদ্বেগ

দেশে সংক্রামক রোগ হাম ও ডেঙ্গু—উভয় ক্ষেত্রেই সাম্প্রতিক পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হাম-উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৭৮৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর ফলে দেশে হাম ও হাম-উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়েছে, যা পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। একই সময়ে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে, যা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়।

অন্যদিকে, দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপও অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১০,১৪৮ জন। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থার কার্যকারিতার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশ্বব্যাপী চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে হাম রোগে মৃত্যুহার সাধারণত প্রতি ১,০০০ আক্রান্তে ১ থেকে ৩ জন, অর্থাৎ প্রায় ০.১ থেকে ০.৩ শতাংশ। তবে অপুষ্টি, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, টিকাদানের ঘাটতি অথবা সীমিত স্বাস্থ্যসেবার এলাকায় এই মৃত্যুহার প্রতি ১,০০০ আক্রান্তে ৩০ থেকে ১০০ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩ থেকে ১০ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে। ফলে হাম প্রতিরোধে সময়মতো টিকাদান, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ ও যথাযথ চিকিৎসা মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অধিকাংশ রোগী দ্রুত চিকিৎসা পেলে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে গুরুতর ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ, শক সিনড্রোম এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জটিলতা দেখা দিলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই জ্বর, তীব্র শরীরব্যথা, বমি, রক্তক্ষরণ বা অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় সব শিশুকে নির্ধারিত সময়ে হামের টিকা প্রদান নিশ্চিত করা। পাশাপাশি অপুষ্টি দূর করা, শিশুদের পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। অন্যদিকে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পরিষ্কার পানি অপসারণ, মশারি ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে কেবল হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, রোগতত্ত্বভিত্তিক নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষকে অধিক সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, দেশে হাম ও ডেঙ্গু—দুই রোগই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হামে ২৪ ঘণ্টায় ৬ জনের মৃত্যু এবং মোট মৃত্যুসংখ্যা ৭০০ অতিক্রম করা যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি ডেঙ্গুতে ১০,১৪৮ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়াও পরিস্থিতির গুরুত্ব নির্দেশ করে। যদিও ডেঙ্গুতে মৃত্যুসংখ্যা বর্তমানে ৯ জন, তবুও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।

এ অবস্থায় সরকারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো টিকাদান, দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে হাম ও ডেঙ্গু—উভয় রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। জনসচেতনতা এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।