রাষ্ট্রায়ত্ব জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে (এমপিএল) তীব্র প্রশাসনিক অরাজকতা, পদোন্নতি ও বদলিতে অনিয়ম, আধুনিকায়নে স্থবিরতা এবং জ্বালানি তেল চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের একাংশের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ।
পর্ষদ চেয়ারম্যানের ‘ওএসডি’ স্ট্যাটাস ও সিদ্ধান্তহীনতার বৃত্ত
অভিযোগকারীদের দাবি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) সচিবকে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। নিয়মিত পর্ষদ সভা না হওয়া এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে চরম বিলম্বের কারণে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অনুমোদন, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম (প্রকিউরমেন্ট), পদোন্নতি ও বদলির মতো বিষয়গুলো ঝুলে রয়েছে। একজন ওএসডি কর্মকর্তার মাধ্যমে পর্ষদ পরিচালনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি তার কাঙ্ক্ষিত গতি হারাচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
পদোন্নতি ও বদলিতে নিয়মের ব্যত্যয়
প্রতিষ্ঠানের পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়া নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিযোগ অনুযায়ী:
পদোন্নতিতে বৈষম্য: যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি অযৌক্তিকভাবে দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। প্রচলিত বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে একই গ্রেডের জুনিয়র কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে, যার ফলে বঞ্চিত হচ্ছেন যোগ্য কর্মীরা।
পছন্দ-অপছন্দের বদলি: বদলি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এবং বাহ্যিক প্রভাবের ভিত্তিতে বদলি বাণিজ্য ও হয়রানি করা হচ্ছে। এতে সামগ্রিক কর্মপরিবেশ এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।
দুই কর্মকর্তার ‘যুগলবন্দী’: একই কর্মস্থলে ১৫ থেকে ২৭ বছর!
বিদ্যমান নীতিমালা লঙ্ঘন করে নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে বছরের পর বছর একই লাভজনক কর্মস্থলে টিকিয়ে রাখার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের উপ-মহাব্যবস্থাপক (পরিচালন) মুজিবুর রহমান চৌধুরী প্রায় ২৭ বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল আছেন।
মেইন ইনস্টলেশনের ব্যবস্থাপক মো. রাশেদুল হক প্রায় ১৫ বছর ধরে একই স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন।
একই কর্মস্থলে এত দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান বদলি নীতিমালার পরিপন্থী এবং এটি প্রশাসনের ভেতরে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অটোমেশনে অনীহা ও আধুনিকায়নে বাধা
ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশের যুগেও মেঘনা পেট্রোলিয়ামকে আধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশনের আওতায় আনতে পর্ষদ ও প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তার চরম অনীহা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু হলে অনিয়ম ও কারচুপি ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়েই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে কাঙ্ক্ষিত আধুনিকায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এই রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানটি।
জ্বালানি তেল চুরির সিন্ডিকেট ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে দেশের পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি, সংরক্ষণ এবং সারাদেশে বিতরণ কার্যক্রমকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি সুসংগঠিত চক্রের মাধ্যমে জ্বালানি তেল চুরি ও বিতরণে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে উপ-মহাব্যবস্থাপক (পরিচালন) মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং মেইন ইনস্টলেশনের ব্যবস্থাপক মো. রাশেদুল হকের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চলছে বলে অভিযোগে জানানো হয়।
জরুরি হস্তক্ষেপ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের টেকসই উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদায়নের দাবি উঠেছে।
আন্দোলনরত ও ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন:
"উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পেছনে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে প্রচলিত আইন ও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে সরকারের অবিলম্বে জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।"
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।