ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১০:৩১:৪৫ PM

প্রকল্পের অর্ধেকই পরামর্শকের পকেটে!

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
07-07-2026 09:09:47 PM
প্রকল্পের অর্ধেকই পরামর্শকের পকেটে!

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভিন্ন শহরে আশ্রয় নেওয়া দরিদ্র ও ভাসমান মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রায় ৬১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব করেছে। জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের শতভাগ অনুদানে পরিচালিত এ প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মোট অর্থের বড় অংশ প্রশাসনিক ও পরামর্শক ব্যয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, আর প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য সরাসরি বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ১৩ শতাংশ।

প্রকল্পটি খুলনা সিটি করপোরেশন, সাতক্ষীরা পৌরসভা, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এবং সিরাজগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় ২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ মোট ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং সমবায়ভিত্তিক আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি শিশু যত্ন, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সামাজিক সেবা এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে আরও প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে পরামর্শক নিয়োগকে কেন্দ্র করে। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী প্রায় ৩০ কোটি টাকা শুধু পরামর্শকদের সম্মানী বাবদ ব্যয় করা হবে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৪৯ শতাংশ। প্রকল্পে প্রায় ৪৭৫ জন পরামর্শক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র ৩০০ জন প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীর বিপরীতে পরামর্শকের সংখ্যা আরও বেশি। একটি সীমিত পরিসরের সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে এত বিপুলসংখ্যক পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বাবদ ১০ কোটি ৩৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং অফিস ভবন ভাড়ার জন্য ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। বৈদেশিক ভ্রমণে ১ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, বিদেশে প্রশিক্ষণে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ভ্রমণে ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, টেলিফোন, নিরাপত্তা সেবা, যানবাহন ভাড়া, জ্বালানি, প্রকাশনা ও অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

ফলে পরামর্শক, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস পরিচালনা এবং দেশি-বিদেশি ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য সরাসরি বরাদ্দের পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবিকা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন—কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ একাধিক পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, বাস্তবায়ন এলাকা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং মেয়াদ নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্পের একটি অংশের নির্ধারিত সময় ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় বাস্তবায়নকাল পুনর্বিন্যাসের সুপারিশও করা হয়েছে।

কমিশন আরও জানতে চেয়েছে, ৩২ কোটি ৬১ লাখ ৭৪ হাজার টাকার সেবা ক্রয়ের প্রতিটি প্যাকেজের পৃথক ব্যয় ও তার যৌক্তিকতা কী। এছাড়া পরামর্শক সেবা, বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, জ্বালানি ব্যয় এবং টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বিদেশ সফরে কতজন কর্মকর্তা অংশ নেবেন, তাদের দায়িত্ব কী হবে এবং প্রকল্পে তার বাস্তব উপযোগিতা কী—এসব বিষয়ও স্পষ্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে প্রশাসনিক ব্যয় থাকা স্বাভাবিক হলেও তা কখনোই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করতে পারে না। সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশিদ বলেছেন, সুবিধাভোগীদের নামে নেওয়া প্রকল্পের অর্থ যদি শেষ পর্যন্ত পরামর্শক, বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ে ব্যয় হয়, তাহলে জনগণের কাছে এমন প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়। তাঁর মতে, প্রকল্প মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত প্রকৃত সুবিধাভোগীরা কতটুকু উপকৃত হচ্ছেন।

একই ধরনের মত দিয়েছেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ বা প্রশাসনিক ব্যয় প্রয়োজন হতে পারে, তবে তা অবশ্যই সীমিত রাখতে হবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরাও ফলাফলভিত্তিক ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ যেন সরাসরি উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে, সেটিই নিশ্চিত করা জরুরি।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও এ প্রকল্পে বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আগামী প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় ব্যয় কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর সুপারিশ আসে কি না, সেটিই এখন সংশ্লিষ্টদের নজরে রয়েছে।