ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১০:৩৯:২৯ PM

তিন দেশে ১০২ কোটি পাচারের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
08-07-2026 09:02:54 PM
তিন দেশে ১০২ কোটি পাচারের অভিযোগ

বাংলাদেশের অন্যতম শিল্পপ্রতিষ্ঠান জেমকন গ্রুপের বিরুদ্ধে রপ্তানির আড়ালে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই বিদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে অন্তত ১০২ কোটি টাকার অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) প্রণীত একটি বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিষয়টি তদন্ত করছে। একই সঙ্গে গ্রুপটির বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণ, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেমকন গ্রুপ চা ও হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানির আড়ালে, ভুয়া রপ্তানি চালান এবং অনুমোদনহীন বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোট ১০২ কোটি ১৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা পাচার করেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা অর্থের পরিমাণ ৬১ লাখ ৩৯ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৫ কোটি ৫৭ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৮ টাকা।

প্রতিবেদনে জেমকন গ্রুপের চেয়ারম্যান আমেনা আহমেদ এবং পরিচালক কাজী নাবিল আহমেদ, কাজী ইনাম আহমেদ ও কাজী আনিস আহমেদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিএফআইইউর মতে, এসব কর্মকাণ্ড মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী অর্থপাচার বা অপরাধলব্ধ সম্পদের আওতায় পড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যে নিবন্ধিত ‘অ্যাগনেটা এলএলসি’ নামে একটি পাইকারি গ্রোসারি ও চা বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানে কাজী আনিস আহমেদের ৭৫ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই কাজী আনিস আহমেদ, কাজী ইনাম আহমেদ এবং কাজী নাবিল আহমেদ প্রতিষ্ঠানটিতে ৬১ লাখ ৩৯ হাজার মার্কিন ডলার ঋণ হিসেবে পাঠান। পরবর্তীতে সেই ঋণ শেয়ারে রূপান্তর করে মালিকানা গ্রহণ করা হয়। বিএফআইইউ এই বিনিয়োগকে সরাসরি অর্থপাচার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এছাড়া যুক্তরাজ্যের ‘টিটুলিয়া ইউকে লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজী আনিস আহমেদ ২ লাখ ৫০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড বিনিয়োগ করেন, যার মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫০ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে কার্যক্রম বন্ধ করে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দুবাইভিত্তিক ‘ডাবল কোর জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি’-তে কাজী আনিস আহমেদের ২৫ শতাংশ মালিকানা রয়েছে এবং তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানে তার পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ প্রায় ৭৫ হাজার দিরহাম।

বিএফআইইউর তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, জেমকন গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান জেমিনি সি ফুড লিমিটেড যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে চারটি ভুয়া রপ্তানি চালানের মাধ্যমে ১৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫৩৫ মার্কিন ডলার মূল্যের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানির কাগজপত্র তৈরি করে। তবে পণ্যগুলো প্রায় এক বছর পর বাংলাদেশে ফেরত আসে। তদন্তকারীদের মতে, পচনশীল পণ্য দীর্ঘ সময় পর ফেরত আসা অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং এটি বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচারের একটি পরিচিত কৌশল হতে পারে। তাদের ধারণা, প্রকৃত রপ্তানি আয় দেশে না এনে বিদেশে অর্থ আটকে রাখার উদ্দেশ্যেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

চা রপ্তানির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেমকন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাগনেটা এলএলসির কাছে আটটি চালানে চা রপ্তানি করলেও ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩১২ মার্কিন ডলারের রপ্তানি মূল্য দীর্ঘ সময়েও দেশে আনেনি। এই অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৬৬৬ টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক একই ব্যক্তি হওয়ায় এটি পরিকল্পিত অর্থপাচারের একটি উদাহরণ হতে পারে।

এছাড়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক কয়েকটি রেমিট্যান্স হাউসের মাধ্যমে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৭ মার্কিন ডলার বাংলাদেশে এনে মেয়াদোত্তীর্ণ রপ্তানি চালানের হিসাব সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। বিএফআইইউর মতে, প্রকৃত আমদানিকারকের পরিবর্তে তৃতীয় দেশ থেকে অর্থ পাঠানো মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী সন্দেহজনক লেনদেনের মধ্যে পড়ে এবং এতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স ব্যবহার করে রপ্তানি আয়ের হিসাব মিলানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।

বিদেশে অর্থপাচারের পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতেও জেমকন গ্রুপের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক এশিয়াসহ ১৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রুপটি মোট ২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এর মধ্যে ১ হাজার ৭৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে, যা খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। একই সঙ্গে একটি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ অন্য ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যবহার এবং গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।

বিএফআইইউর প্রতিবেদন দুদক ও সিআইডির কাছে পাঠানোর পর দুদক তিনটি মামলা দায়ের করেছে। মামলায় কাজী আনিস আহমেদের বিরুদ্ধে ৮০ কোটি ৩৫ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২০টি ব্যাংক হিসাবে ৭৯ কোটি ১৪ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। কাজী ইনাম আহমেদের বিরুদ্ধে ৩২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৪টি ব্যাংক হিসাবে ৭৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। কাজী নাবিল আহমেদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় মামলা করা হয়েছে।

বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানিয়েছেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনে বিএফআইইউ তদন্তে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ নেই এবং এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার।

অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে জেমকন গ্রুপের পরিচালক কাজী ইনাম আহমেদ ও কাজী আনিস আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে জেমকন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন খান দাবি করেন, অভিযোগগুলো তার যোগদানের আগের সময়ের এবং এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি আইনগতভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করবে।

সামগ্রিকভাবে বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বিদেশে অনুমোদনহীন বিনিয়োগ, রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচার, রেমিট্যান্স জালিয়াতি, অস্বাভাবিক ব্যাংক লেনদেন এবং বিপুল পরিমাণ ঋণ অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।