ঢাকা, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৯:২২:৪৯ PM

নিষিদ্ধের পরও সারাদেশেই চলছে ছাত্রলীগের কার্যক্রম

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
10-07-2026 07:48:48 PM
নিষিদ্ধের পরও সারাদেশেই চলছে ছাত্রলীগের কার্যক্রম

সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর সংগঠনটির প্রকাশ্য সাংগঠনিক উপস্থিতি কমে এলেও, বিভিন্ন কৌশলে তারা পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এবং ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সংগঠনটির একাংশ সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। সে সময় শিক্ষাঙ্গনে দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের নানা অভিযোগ সংগঠনটির বিরুদ্ধে বারবার উঠে আসে। সিলেট এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে আসা এক তরুণী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নাম সামনে আসে। একইভাবে ভারতীয় আধিপত্যবাদের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার জেরে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দোষী সাব্যস্ত হন। এসব ঘটনার পর সংগঠনটির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।

গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের প্রকাশ্য আধিপত্যের অবসান ঘটে। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, সংগঠনটির একটি অংশ এখন প্রকাশ্যে নয়, বরং ছদ্মবেশে ও ভিন্ন কৌশলে নিজেদের সাংগঠনিক যোগাযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের আড়ালে কিংবা বিভিন্ন অনিবন্ধিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনের সময় অনেক নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও, তাদের একটি অংশ এখনও সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। পলাতক সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কৌশল নিয়েও আলোচনা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হল এলাকায় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারহান তানভীর নাসিফের নেতৃত্বে একটি ঝটিকা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পরে পুলিশ নাসিফ ও তার সঙ্গে থাকা মাইক্রোবাসচালক রুবেল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। আদালত পরবর্তীতে নাসিফকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এই ঘটনাকে নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রকাশ্য পুনরুত্থানের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে ছাত্রলীগের অনেক নেতা আজিমপুর, চানখাঁরপুল, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট ও মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকে তারা পোস্টারিং, দেয়াললেখন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং সুযোগ বুঝে ঝটিকা মিছিলের মতো কর্মসূচি পরিচালনা করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচন নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নিষিদ্ধ হওয়ার পরও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি পরিচয় গোপন রেখে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। তাদের মধ্যে সূর্য সেন হল ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক আয়ান আব্দুল্লাহ, উপ-শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক মোহাম্মদ রিয়াজ মাতাব্বর, রাজিন হোসেন, আবিদ আব্দুল্লাহ, শামীম হোসেন ও আরাফাত চৌধুরীর নাম আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা ভিন্ন পরিচয়ে নির্বাচন করলেও নিজেদের মধ্যে সমন্বয় রেখে প্রচারণা চালিয়েছেন এবং সংগঠনের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেছেন।

এছাড়া নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থায়নের বিষয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রবাসী ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে উপস্থাপিত হয়নি।

এদিকে "নেক্সট জেন বাংলাদেশ" নামে একটি সামাজিক প্ল্যাটফর্ম নিয়েও ক্যাম্পাসে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ছাত্রলীগের কিছু সাবেক নেতা-কর্মী নতুন পরিচয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে যুক্তদের দাবি, এটি সম্পূর্ণ সেবামূলক ও সামাজিক উদ্যোগ এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত নয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, খেলার মাঠ ও অনুষদ এলাকায় ছোট ছোট বৈঠকের মাধ্যমেও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বৈঠকে সাংগঠনিক পুনর্গঠন, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং অরাজনৈতিক ব্যানারে কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।

একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সংগঠনটির তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছদ্মনামে গ্রুপ খুলে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। অডিও-ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া, অর্থ সংগ্রহ এবং কর্মীদের সমন্বয়ের কাজ পরিচালিত হচ্ছে বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি ফেক আইডি ব্যবহার করে বিরোধীদের লক্ষ্য করে হুমকি, ট্রলিং ও অনলাইন বুলিংয়ের অভিযোগও রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের পর নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রম সীমিত হলেও, অনলাইন নেটওয়ার্ক ও বিকল্প প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখার প্রবণতা নতুন নয়। তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ যাচাই এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাজনৈতিক অভিযোগ ও বাস্তব ঘটনার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সামগ্রিকভাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের পুনর্গঠনের যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা দেশের ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষাঙ্গনে শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।