ঢাকা, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৫:৫৭:৩৮ PM

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ও সংকটকালীন ভূমিকা

মান্নান মারুফ
10-07-2026 03:49:13 PM
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ও সংকটকালীন ভূমিকা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দেশের সামরিক নেতৃত্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ প্রায় চার দশকের সামরিক জীবনে তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব এবং দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে অর্জিত অভিজ্ঞতা, কৌশলগত নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে তিনি একজন পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০২৪ সালের ২৩ জুন তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৮তম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের জন্ম ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৬ সালে। তাঁর পৈতৃক নিবাস শেরপুর জেলায়। তিনি বাংলাদেশের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে উচ্চতর সামরিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ তাঁর সামরিক নেতৃত্ব, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

১৯৮৫ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন, একটি পদাতিক ব্রিগেড এবং একটি পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকস, সেনা সদর দপ্তর এবং সামরিক সচিবের শাখায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে তিনি সেনা সদর দপ্তরের সামরিক সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। পরে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর তিনি আর্মি সার্ভিস কোরের সপ্তম কর্নেল কমান্ড্যান্ট হিসেবে অভিষিক্ত হন।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি অ্যাঙ্গোলা ও লাইবেরিয়ায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সিনিয়র অপারেশন অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি বহুজাতিক পরিবেশে নেতৃত্ব, সমন্বয় এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

২০২৪ সালের ২৩ জুন সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর ওপর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেনাবাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পিত হয়। সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি একটি আধুনিক, দক্ষ ও পেশাদার বাহিনী গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুত্বারোপ করেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি শান্তি, সংযম এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার কথা ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় এবং ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে নতুন সরকারের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন।

৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক, বিশ্লেষক এবং সাধারণ নাগরিকের মতে, সংকটময় সময়ে তিনি সংযম, ধৈর্য এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাঁদের মতে, সেনাবাহিনীকে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশের মাধ্যমে তিনি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রাখেন। তাঁদের মূল্যায়নে, তাঁর পদক্ষেপের ফলে দেশের পরিস্থিতি আরও অবনতির ঝুঁকি কমে এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের স্ত্রী বেগম সারাহনাজ কমলিকা। তাঁদের দুই কন্যা রয়েছে। তিনি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানের জামাতা। যদিও তাঁর পারিবারিক পরিচয় বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে, তবুও তাঁর পেশাগত মূল্যায়ন প্রধানত দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতেই করা হয়।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নেতৃত্ব সম্পর্কে জনমতের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে। একদল মানুষ তাঁকে একজন বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ এবং পেশাদার সেনাপ্রধান হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁদের মতে, তিনি দেশের সংকটময় সময়ে সংযম, দায়িত্বশীলতা এবং বাস্তববাদী নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক মহল ও বিশ্লেষক তাঁর কিছু সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। ফলে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় ধরনের আলোচনা বিদ্যমান।

বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল নূরউদ্দিন খান, জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানসহ একাধিক সেনাপ্রধান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। কে সবচেয়ে সফল বা শ্রেষ্ঠ সেনাপ্রধান—এ বিষয়ে কোনো সরকারি বা সর্বজনস্বীকৃত র‌্যাঙ্কিং নেই। এটি মূলত ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের মূল্যায়নের বিষয়। তবে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের অবদানও ভবিষ্যতে ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও গবেষণার মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ, পেশাদার এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে সাফল্যের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন এবং দেশের সামরিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় তাঁর ভূমিকা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সেই ভূমিকা নিয়ে তার প্রশংসা রয়েছে,। ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, গবেষণা এবং সময়ের বিচারের মাধ্যমেই তাঁর নেতৃত্ব ও অবদানের চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ধারিত হবে।