ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০২:৩২:৪৭ PM

বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল ঘিরে ব্যাপক তৎপরতা

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
11-07-2026 01:14:47 PM
বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল ঘিরে ব্যাপক তৎপরতা

আসন্ন ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে দলীয় পুনর্গঠনের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে নেমেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটিয়ে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকে আরও গতিশীল, আধুনিক ও কার্যকর রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করার লক্ষ্যে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ব্যাপক পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির আন্দোলন-সংগ্রাম রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেও দলীয় কাঠামো ঢেলে সাজানো হচ্ছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, পুনর্গঠনের আওতায় শুধু বিএনপির মূল সংগঠনই নয়, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, মহিলা দল, শ্রমিক দল, মৎস্যজীবী দলসহ গুরুত্বপূর্ণ সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

যদিও জাতীয় কাউন্সিলের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তারেক রহমানের ধারাবাহিক বৈঠক ও সাংগঠনিক নির্দেশনা

দলীয় সূত্র জানায়, গত সপ্তাহের শনিবার রাতে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা জেলা বিএনপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি এবং জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনা, দলীয় শৃঙ্খলা সুসংহত রাখা, তৃণমূলকে আরও শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ ছাড়া সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেন তিনি। দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হলে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি এবং অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সঙ্গেও তারেক রহমান বৈঠক করবেন। পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে গুরুত্ব

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সংসদীয় কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হওয়ায় এখন কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে জাতীয় কাউন্সিলের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই দলের মূল শক্তি। তাই সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ইউনিটের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রয়োজনে সাংগঠনিক স্বার্থে পরিবর্তন আনা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অঙ্গসংগঠনে বড় ধরনের রদবদলের আভাস

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। যে কোনো সময় এসব সংগঠনের আংশিক বা ‘সুপার ফাইভ’ কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।

এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, মহিলা দল এবং মৎস্যজীবী দলের নতুন আংশিক কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় কাউন্সিলের আগেই এসব কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে সম্ভাব্য নতুন কমিটিতে স্থান পেতে মহানগর পর্যায়ের অনেক নেতা ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ, লবিং ও তদবির শুরু করেছেন বলেও জানা গেছে।

পুনর্গঠনে যেসব বিষয় পাচ্ছে অগ্রাধিকার

পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ছাত্রদলের ক্ষেত্রে নিয়মিত শিক্ষার্থী, মেধাবী, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এবং রাজপথে সক্রিয় তরুণ নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের ক্ষেত্রে অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী, রাজনৈতিক মামলা-হামলার শিকার এবং মাঠপর্যায়ে পরীক্ষিত নেতাদের নেতৃত্বে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অন্যদিকে মহিলা দল ও শ্রমিক দলে নারীনেতৃত্বের বিকাশ এবং তৃণমূলের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীকে আরও কার্যকরভাবে সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ

বর্তমানে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের অধিকাংশ কমিটিই বহু আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। দলটির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টির মেয়াদও দীর্ঘদিন আগে শেষ হয়েছে। কোথাও তিন বছর, কোথাও পাঁচ বছর, আবার কোথাও এক যুগ ধরে একই কমিটি বহাল রয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটের অনেক শীর্ষ নেতা বর্তমানে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। এতে নতুন নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যেই বিএনপি এখন ব্যাপক পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে।

নিষ্ক্রিয়দের বাদ, ত্যাগীদের মূল্যায়ন

দলীয় সূত্র জানায়, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তারেক রহমান। অতীতে যারা রাজপথে নিষ্ক্রিয় ছিলেন কিংবা সুযোগসন্ধানী ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হবে না। বরং প্রতিকূল সময়ে দলের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন এবং মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার কিংবা রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—এমন নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, দল এখন আর আপসের নীতিতে বিশ্বাসী নয়। যারা কঠিন সময়েও দলের পতাকা বহন করেছেন, ভবিষ্যতে তারাই নেতৃত্বের মূল দায়িত্বে থাকবেন।

পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ অব্যাহত রয়েছে। দলীয় নেতৃত্ব উপযুক্ত সময় বিবেচনা করেই নতুন কমিটি ঘোষণা করবে।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই নেতৃত্ব বহাল থাকায় বিএনপির অনেক সাংগঠনিক ইউনিটে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তাদের মতে, তরুণ, মেধাবী এবং রাজপথে পরীক্ষিত নেতাদের নেতৃত্বে আনার উদ্যোগ সংগঠনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন ভবিষ্যতে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে বিএনপির এই পুনর্গঠন কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনের উদ্যোগ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক সংস্কার, তৃণমূলকে শক্তিশালী করা এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দলকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করে তোলার একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।