ঢাকা, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৭:২১:২১ PM

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে দলিল কেলেঙ্কারির অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
29-07-2026 10:41:01 AM
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে দলিল কেলেঙ্কারির অভিযোগ

ঢাকার কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল জালিয়াতি, ঘুষ, রাজস্ব ফাঁকি, ভুয়া দাতা দেখিয়ে দলিল নিবন্ধনসহ নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী, দলিল লেখক এবং স্থানীয় বাসিন্দা। অভিযোগে সরকারি সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, জাল কাগজপত্র ব্যবহার, দলিলের তথ্য পরিবর্তন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো একাধিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ বা ‘টেবিল মানি’ প্রদান ছাড়া অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয় না। সেবাগ্রহীতাদের দাবি, ঘুষ ছাড়া ওই অফিসে কোনো ধরনের কাজ এগোয় না। ফলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা পেতে আগেই অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে অফিসে আসতে বাধ্য হন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অফিসের নকল নবিস মো. ফারুক ও মেহেদী হাসান রুমেলের মাধ্যমে কাজ না করলে সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়। তাদের মাধ্যমে কাজ করলেই দ্রুত সেবা পাওয়া যায়, অন্যথায় অযথা বিলম্ব ও জটিলতার সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দলিল লেখক জানান, দলিল লেখকদের কাছ থেকেও নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। সরকারি ওমেদারদের বাদ দিয়ে কমিশনভিত্তিক দলিল নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। কমিশন দলিলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দাতার বাড়িতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। কেউ অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে দলিল নিবন্ধন আটকে রাখা বা বিলম্বিত করার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ভুয়া দাতার টিপসই ব্যবহার করে কমিশন দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিবন্ধিত দলিলের তথ্য পরিবর্তন করে প্রকৃত মালিকদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে নকল নবিস মেহেদী হাসান রুমেলের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের তথ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে অনিয়ম করার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ভুয়া দাতা দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি এবং পে-অর্ডার জালিয়াতির মাধ্যমেও অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষও আর্থিক ও আইনগত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

অভিযোগে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আড়াকুল মৌজার একটি জমির ২০২৫ সালের ১২ মার্চ নিবন্ধিত বায়নানামা দলিলের মূল্য পরে পরিবর্তন করে কম দেখানো হয়। এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি পরবর্তী সাফ কবলা দলিলে মূল বায়না গ্রহীতার পরিবর্তে তার ছেলের নামে দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় এক লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও আনা হয়েছে।

আরেকটি ঘটনায় বেয়ারা মৌজার একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল নিবন্ধনের সময় ভুয়া নামজারি ও খাজনার কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের পাশাপাশি অফিস খরচের নামে আরও এক লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

এ ছাড়া বাঘৈর মৌজার একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল গ্রহীতাকে কোনো ধরনের নোটিশ না দিয়েই বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এক ভুক্তভোগী। তার দাবি, এ জন্য সাব-রেজিস্ট্রার ১০ লাখ টাকা এবং অফিস খরচের নামে আরও দুই লাখ টাকা গ্রহণ করেন। অভিযোগকারী আরও বলেন, দলিল বাতিলের আগেই সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির জন্য এক কোটি ২০ লাখ টাকা হাতবায়না দেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি মিরপুরে স্ত্রীর নামে একটি বাড়ি এবং শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, এর আগে তিনি মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল, ফরিদপুরের চরভদ্রাসন ও সদরপুর, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, ঢাকা উত্তরার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং ময়মনসিংহের ত্রিশালে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তিনি কেরানীগঞ্জ দক্ষিণে বদলি হয়ে এসে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অনিয়মের সুযোগ নিয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী, দলিল লেখক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।