ঢাকা, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৭:২২:০৯ PM

হুয়াওয়ে হেডকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
29-07-2026 12:35:54 PM
হুয়াওয়ে হেডকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্পষ্ট আপত্তি, প্রকাশ্য অনুসন্ধান এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) বহুল আলোচিত ৫জি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ আবারও জোরদার হয়েছে। এবার প্রকল্পের অবশিষ্ট কার্যক্রম চালিয়ে নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগ নিয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে দুদকে পাঠানো এক চিঠিতে প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এদিকে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিতর্কিত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে।

এর আগে একই প্রকল্পের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার তৎকালীন বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দুদক চেয়ারম্যানের কাছে আধা-সরকারি (ডিও) চিঠি দিয়ে প্রকল্পটি চালিয়ে নিতে সহযোগিতা চেয়েছিলেন। তখন বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। বুয়েটের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক প্রকাশ্য অনুসন্ধান শুরু করে।

অনুসন্ধানে উঠে আসে, যেখানে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা সম্ভব, সেখানে অতিরিক্ত সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কিনে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৩২৬ কোটিতে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় বহু গুণ বেশি সক্ষমতার এসব যন্ত্রপাতি ভবিষ্যতে ব্যবহার না হয়ে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকবে, যা সরকারি অর্থের অপচয়ের শামিল।

সর্বশেষ নথি অনুযায়ী, গত ৫ মে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা-৩ শাখা থেকে দুদকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি, এলসি, কারিগরি মূল্যায়নসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে দুদকের আগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, ‘৫জির উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের চলমান কাজ এগিয়ে নিতে দুদকের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।

তবে দুদক সূত্র বলছে, কমিশনের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। গত বছরের ১৮ জুন দুদক মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানিয়েছিল, প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তাই অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে অবশিষ্ট ক্রয়কার্য চালিয়ে গেলে তা আইনের ব্যত্যয় হবে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ ব্যয় আইনসিদ্ধ হবে না।

দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অনুসন্ধান কমিটি ইতোমধ্যে তদন্ত শেষ করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলার কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি দাবি করেন, মামলায় ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবসহ ৪১ জনকে আসামি করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি হুয়াওয়ের সঙ্গে বিটিসিএলের সম্পাদিত চুক্তি বাতিল এবং প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য সিপিটিইউকে সুপারিশ করার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

বুয়েটের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিটিসিএলের সম্ভাব্য ব্যান্ডউইথ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৬.২ টেরাবাইট এবং সেই অনুযায়ী ১০০জি প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোর সুপারিশ করা হয়। কিন্তু প্রকল্পে ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণেই প্রকল্প ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায় এবং দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে।

মন্ত্রণালয়ের দাবি, আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির গুণগত মান যাচাইয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তাদের প্রতিবেদনে যন্ত্রপাতিকে গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, যন্ত্রপাতির মান ভালো হলেই তা কেনার যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয় না। মূল প্রশ্ন হলো, এত বেশি সক্ষমতার যন্ত্রপাতির আদৌ প্রয়োজন ছিল কি না এবং কেন বুয়েটের সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ বলেন, দুদক লিখিতভাবে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা জানানোর পরও প্রকল্প চালিয়ে নিতে চাপ সৃষ্টি করা কমিশনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কিত হুয়াওয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই প্রকল্পের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্ত প্রভাবিত করার যে কোনো প্রচেষ্টা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী।