ঢাকা, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৪৮:১৩ AM

গল্প :তুমি.....?

মান্নান মারুফ
31-07-2026 03:52:40 PM
গল্প :তুমি.....?

সন্ধ্যার শেষ আলোটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের ছোট্ট কাঁচা রাস্তার ধারে পুরোনো বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল রাফি। তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক অপেক্ষা। হাতে ছোট্ট একটি লাল গোলাপ, কিন্তু বুকের ভেতর হাজারো অজানা ভয়।

আজ নীলা শহরে চলে যাবে। উচ্চশিক্ষার জন্য অনেক দূরে। হয়তো মাসের পর মাস দেখা হবে না। অথচ এতদিনেও রাফি তার মনের কথাটা ঠিকমতো বলতে পারেনি।

কিছুক্ষণ পর নীলা ধীরে ধীরে হেঁটে এলো। সাদা সালোয়ার-কামিজে তাকে যেন আরও শান্ত, আরও সুন্দর লাগছিল। রাফিকে দেখে মুচকি হেসে বলল,

— এত জরুরি করে ডাকলে কেন?

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনে হচ্ছিল, সব শব্দ যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। তারপর হঠাৎ করেই বুকের ভেতরের সব কষ্ট একসাথে বেরিয়ে এলো।

"তুমি কি বোঝ না? আমি তোমারে পাগলের মতো ভালোবাসি, আমি তোমারে ছাড়া বাঁচমু না..."

কথাগুলো বলেই সে মাথা নিচু করে ফেলল। তার কণ্ঠ কাঁপছিল, চোখে জমে উঠেছিল অশ্রু।

নীলা কিছু বলল না। শুধু অনেকক্ষণ রাফির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার হাত থেকে গোলাপটা নিয়ে বলল,

— এতদিনে বললে?

রাফি অবাক হয়ে তাকাল।

— মানে?

নীলা হেসে বলল,

— আমি তো অনেক আগেই বুঝেছিলাম। শুধু চেয়েছিলাম, একদিন তুমি নিজের মুখে বলো।

রাফির মুখে অবিশ্বাসের ছাপ।

— তাহলে... তুমি?

নীলা মাথা নত করে ফিসফিস করে বলল,

— আমিও তোমাকে ভালোবাসি।

সেদিন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছিল রাফিকে। মনে হচ্ছিল, আকাশের সব তারা যেন তার জন্যই জ্বলে উঠেছে।

কিন্তু সুখের মুহূর্তগুলো সবসময় দীর্ঘ হয় না।

পরদিন ভোরেই নীলা শহরের উদ্দেশে চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বলেছিল,

— আমার ওপর বিশ্বাস রেখো। দূরত্ব ভালোবাসাকে কমায় না, যদি মন সত্যি হয়।

দিন কেটে যেতে লাগল। শুরু হলো দূরত্বের সম্পর্ক। ফোনে কথা, ভিডিও কলে হাসি, রাত জেগে গল্প—এসব দিয়েই দুজনের দিন চলতে লাগল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়ে গেল। নীলার পড়াশোনা, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ। আর রাফি গ্রামের ছোট্ট দোকানে বাবার সঙ্গে কাজ করতে লাগল।

অনেক সময় নীলা ফোন ধরতে পারত না। রাফির মন খারাপ হতো। সে ভাবত, নীলা হয়তো বদলে যাচ্ছে।

একদিন অভিমান করে রাফি ফোনই করল না।

সেদিন রাতেই নীলার মেসেজ এল।

"আজ সারাদিন হাসপাতালে ছিলাম। আমার মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তুমি একবারও জানতে চাওনি আমি কেমন আছি?"

মেসেজটা পড়ে রাফির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসার সবচেয়ে বড় শত্রু সন্দেহ।

সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ।

রাফি বলল,

— আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি শুধু নিজের কষ্টটাই দেখেছি, তোমারটা বুঝিনি।

নীলা শান্ত গলায় বলল,

— ভালোবাসা মানে শুধু কাছে থাকা নয়। একে অপরকে বিশ্বাস করাও ভালোবাসা।

এরপর থেকে দুজন আরও পরিণত হয়ে উঠল। তারা ঠিক করল, যত ঝড়ই আসুক, একে অপরের হাত ছাড়বে না।

দুই বছর পর নীলা পড়াশোনা শেষ করে গ্রামে ফিরল।

সেদিনও সেই পুরোনো বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল রাফি। তবে এবার তার হাতে শুধু গোলাপ নয়, ছিল ছোট্ট একটি আংটি।

নীলা এসে হাসতে হাসতে বলল,

— আবার ডেকেছ কেন?

রাফি হাঁটু গেড়ে বসে বলল,

— এবার আর বিদায় বলতে নয়। সারাজীবনের জন্য তোমাকে নিজের করে নিতে।

চারপাশে তখন হালকা বাতাস বইছে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে আকাশ লাল রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে।

নীলার চোখ ভিজে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে দিল।

— আমি তো অনেক আগেই তোমার হয়েছি।

কয়েক মাস পর দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হলো। খুব জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান ছিল না, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না।

বিয়ের পর একদিন সন্ধ্যায় দুজনে আবার সেই বটগাছটার নিচে গেল।

নীলা হেসে বলল,

— মনে আছে? এই জায়গাতেই তুমি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলে...

রাফি হেসে কথাটা শেষ করল,

— "তুমি কি বোঝ না? আমি তোমারে পাগলের মতো ভালোবাসি, আমি তোমারে ছাড়া বাঁচমু না।"

নীলা মৃদু হেসে তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,

— এখন বুঝি। খুব ভালো করেই বুঝি। তবে একটা কথা মনে রেখো, মানুষ শুধু ভালোবাসার জন্য বেঁচে থাকে না; ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য বেঁচে থাকে।

রাফি মাথা নাড়ল। সে বুঝে গিয়েছিল, সত্যিকারের ভালোবাসা শুধু আবেগের কথা নয়, বরং বিশ্বাস, সম্মান, ধৈর্য আর একে অপরের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি।

বছর কেটে গেল। তাদের ছোট্ট সংসারে এলো এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। সন্ধ্যা হলে তারা তিনজন মিলে সেই পুরোনো বটগাছটার পাশ দিয়ে হাঁটতে যেত। মেয়েটি একদিন কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

— বাবা, তুমি মাকে এত ভালোবাসো কেন?

রাফি হেসে নীলার দিকে তাকাল। তারপর বলল,

— কারণ তোমার মা শুধু আমার জীবনের ভালোবাসা নয়, আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু। সুখে-দুঃখে যে মানুষটি পাশে থাকে, তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা যায়।

নীলা মৃদু হেসে বলল,

— আর তোমার বাবা আমাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা কখনও শুধু কথায় নয়, কাজেও প্রমাণ করতে হয়।

সেদিন আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছিল। বাতাসে ছিল শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ। রাফি মনে মনে সেই দিনের কথা স্মরণ করল, যেদিন কাঁপা কণ্ঠে বলেছিল, "তুমি কি বোঝ না? আমি তোমারে পাগলের মতো ভালোবাসি, আমি তোমারে ছাড়া বাঁচমু না।"

আজ সে জানে, ভালোবাসা কাউকে হারিয়ে ফেলার ভয় নয়; বরং প্রতিদিন একে অপরকে নতুন করে বেছে নেওয়ার নাম। আর সেই বেছে নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সারাজীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প। সমাপ্ত।।