ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০২:৩২:৩৫ AM

৪৪ হাজার লিটার তেল চুরির নেপথ্যে নজরুল

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
11-09-2026 07:07:18 PM
৪৪ হাজার লিটার তেল চুরির নেপথ্যে নজরুল

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজের জ্বালানি তেল চুরি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং ঠিকাদারি অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে। এর মধ্যে চাঁদপুর নদীবন্দরের টাগবোট ‘দুর্দান্ত’-এর মাস্টার নজরুল ইসলাম এবং নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের চাঁদপুর কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক মো. সবুর খানের নামও উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান সরকারি ডিপো থেকে ডিজেল ও লুব-অয়েল ক্রয়ের নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশনার পর চাঁদপুর ডিপো থেকে ১৮ মার্চ থেকে ধাপে ধাপে চার দফায় মোট ৪৪ হাজার লিটার ডিজেল ও লুব-অয়েল সংগ্রহ করা হয়।

কাগজপত্রে এসব জ্বালানি বিভিন্ন নৌযানে সরবরাহ করা হয়েছে বলে দেখানো হলেও বাস্তবে তার বড় অংশ সরবরাহ না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নথিতে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘রুস্তম’-এর নামে ৮ হাজার লিটার, ওয়ার্কবোট ‘কপোত’-এর নামে ৩ হাজার লিটার এবং ‘আড়িয়াল খাঁ’-এর নামে ৫ হাজার লিটার ডিজেল দেখানো হয়। একইভাবে টাগবোট ‘দুর্দান্ত’-এর নামে ২৬ হাজার লিটার এবং এসএমবি-৩ মার্কিং বোটের নামে ২ হাজার লিটার ডিজেল সরবরাহের হিসাব রয়েছে।

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, সংশ্লিষ্ট সময়ে ‘রুস্তম’ ও ‘দুর্দান্ত’ কোনো উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়নি। অন্যদিকে, এসএমবি-৩ মার্কিং বোটটি ব্যবহার না করে ভাড়াকৃত সাধারণ নৌকার মাধ্যমে মার্কিং কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে গত তিন মাসে অতিরিক্ত ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ভাড়া বিল দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ৯৫ টাকা হিসাবে ৪৪ হাজার লিটার জ্বালানির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই জ্বালানি সরকারি কাজে ব্যবহারের পরিবর্তে একটি চক্র খোলা বাজারে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের আরও গুরুতর অংশে বলা হয়েছে, গত ৩০ মে গভীর রাতে টাগবোট ‘দুর্দান্ত’ থেকে পাম্পের মাধ্যমে চাঁদপুরের এক তেল ব্যবসায়ীর ট্যাংকারে সরকারি ডিজেল স্থানান্তর করা হয়। গোপন সিসিটিভি ফুটেজে মাস্টার নজরুল ইসলামকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পাহারা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জাহাজের কয়েকজন কর্মচারী বিষয়টি দেখতে পেয়ে আপত্তি জানালে তাদের ১১ লাখ টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে চাকরিচ্যুতি ও বদলির হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাস্টার নজরুল ইসলাম। তিনি তেল চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে কথিত ভিডিও প্রকাশের বিষয়ে সংবাদ না করার জন্য অনুরোধ করেছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, চাঁদপুর নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মো. সবুর খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা স্বীকার করলেও বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, জ্বালানি বিতরণ রেজিস্টার, নৌযানের লগবুক, ডিপো থেকে তেল উত্তোলনের হিসাব এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

সচেতন নাগরিক ও বিআইডব্লিউটিএর সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, সরকারি সম্পদ রক্ষায় জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি, ডিজিটাল হিসাব সংরক্ষণ এবং নিয়মিত অডিট জরুরি। পাশাপাশি অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা নিশ্চিত হলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।