ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০২:৩৩:০০ AM

হাই-টেক পার্কে অনিয়ম, ওএসএস ঘিরে রহস্য

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
11-09-2026 06:43:42 PM
হাই-টেক পার্কে অনিয়ম, ওএসএস ঘিরে রহস্য

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ও উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ-বাণিজ্য, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা, কেনাকাটা ও টেন্ডারের গোপন তথ্য পাচার, ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস), অনাপত্তিপত্র (এনওসি), জমি ও স্পেস বরাদ্দ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে আইসিটি বিভাগ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

এরই মধ্যে গত ৬ সেপ্টেম্বর পৃথক অফিস আদেশে আনোয়ার হোসেনকে চট্টগ্রামের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে এবং মো. শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে যশোরের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। আদেশ অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাঁদের নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। তবে শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার বদলি আদেশ কার্যকর হওয়া নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নির্ধারিত সময় পার হলেও শফিক নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমানও জানিয়েছেন, শফিক দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না এবং তিনি শুনেছেন, বদলিকৃত কর্মস্থলেও শফিক যোগদান করেননি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—বদলি আদেশ বাস্তবায়নে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে কি না, নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার বিষয়ে কোনো লিখিত অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না এবং এর পেছনে কারও প্রভাব রয়েছে কি না।

শুধু বদলি করলেই দীর্ঘদিনের অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। কারণ শফিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সঙ্গে হাই-টেক পার্কের প্রশাসন, প্রকল্প, টেন্ডার, ওএসএস, এনওসি এবং জমি-স্পেস বরাদ্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম জড়িত। তদন্ত চলাকালে এসব সংবেদনশীল নথি, ফাইল, ই-ফাইল কিংবা ডিজিটাল তথ্যের ওপর তাঁর কোনো ধরনের প্রবেশাধিকার থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও নথির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, শফিক উদ্দীন ভূঁইয়া একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে ১২টি জেলায় আইটি/হাই-টেক পার্ক স্থাপন প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একান্ত সচিব, বিভিন্ন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক, ওএসএস, টেকনিক্যাল ও প্ল্যানিং শাখার দায়িত্বসহ তাঁর মূল প্রশাসনিক পদও ছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। একজন কর্মকর্তার হাতে এতগুলো সংবেদনশীল দায়িত্ব কীভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এসব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং এ বিষয়ে কোনো আপত্তি বা অডিট পর্যবেক্ষণ ছিল কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আর্থিক বিষয়েও শফিককে ঘিরে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তাঁর মূল বেতন বাবদ মোট ৬ লাখ ৯১ হাজার ৩১৪ টাকা অতিরিক্ত ও অনিয়মিত উত্তোলনের বিষয় সরকারি অডিটে উঠে আসে। ওই অর্থ পরবর্তী সময়ে ফেরত বা সমন্বয় করা হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে তার নথি কী—তা যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরের ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ হিসেবে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা খরচ দেখানোর বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এর একটি অংশ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

শফিককে ঘিরে বড় অভিযোগগুলোর একটি ওএসএস ও এনওসি-সংক্রান্ত কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, স্যামসাংসহ বিভিন্ন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ডিউটি-ফ্রি ইকুইপমেন্ট আমদানির অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার গোপন লেনদেন হয়েছে। একই সঙ্গে ১২টি আইটি পার্ক প্রকল্পের ট্রেনিং ও কনস্ট্রাকশন টেন্ডার এবং পার্কগুলোর জমি ও স্পেস বরাদ্দকে কেন্দ্র করে কয়েক কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ফাইল, অনুমোদন, অর্থনৈতিক লেনদেন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নথি যাচাই করা জরুরি।

অন্যদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনকে ঘিরেও রয়েছে নানা অভিযোগ। পুরোনো কর্মী তালিকায় তাঁকে ‘কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক’ হিসেবে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত থাকার তথ্য রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে তাঁর উত্থান হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

আনোয়ারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, সাবেক প্রতিমন্ত্রীর এপিএস রঞ্জিত কুমারের নেতৃত্বাধীন একটি নিয়োগ-সিন্ডিকেটের সহযোগী হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, নাটোরের সিংড়ায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার প্রকল্পে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অন্তত ১০ জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে টেন্ডারের গোপন প্রাক্কলন বা টেন্ডার এস্টিমেট আগেই নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাছে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।

সব মিলিয়ে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রকল্প, নিয়োগ, টেন্ডার, ওএসএস, এনওসি, জমি-স্পেস বরাদ্দ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ‘মানি ট্রেইল’ ও ‘ফাইল ট্রেইল’ অনুসরণ করে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়মুক্তিও নিশ্চিত করা দরকার।

হাই-টেক পার্কের এমডি ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, শফিককে বদলি করা হয়েছে এবং তিনি দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না। বদলিকৃত কর্মস্থলেও তিনি যোগদান করেছেন কি না, তা তিনি শুনেছেন মাত্র। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন—বদলি কি জবাবদিহির বিকল্প? প্রশাসনিকভাবে বদলি একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা হলেও, গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ করে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করাই হওয়া উচিত চূড়ান্ত লক্ষ্য।