ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দায়িত্ব নেওয়ার পর মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে আগের তুলনায় বাড়ছে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিও।
মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন পর তারা নিজেদের সাংগঠনিক সমস্যা, স্থানীয় বিরোধ এবং ব্যক্তিগত কষ্টের কথা তুলে ধরার জন্য একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে কাছে পেয়েছেন। জেলা, উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে সরাসরি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও সাংগঠনিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি সমাধানের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তারা।
নেতা-কর্মীরা বলছেন, কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ায় তাদের মধ্যে আস্থা ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে সাংগঠনিক নানা বিষয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন। এতে তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্ব কমছে এবং দলীয় কর্মকাণ্ডে সমন্বয়ও বাড়ছে বলে মনে করছেন তারা। এ ছাড়া তিনি সকল নেতা কর্মীদের ফোনও রিসিভ করায় অনেকে ফোনেই তাদের সমস্যার সমাধান খুজে পাচ্ছেন।
তাদের মতে, একজন দায়িত্বশীল নেতা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন—এমন অনুভূতি তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। ফলে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণও আগের তুলনায় বেড়েছে।
দলের একাধিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রিজভী দায়িত্ব নেওয়ার পর দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এড়িয়ে চলা এবং বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকে নেতা-কর্মীদের বিরত থাকার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। এর প্রভাব দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে পড়েছে বলেও দাবি তাদের।
তাদের মতে, দেশের বিভিন্ন শহর, বন্দর, গ্রাম, থানা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আগের তুলনায় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিকভাবে দলীয় কর্মকাণ্ডে শৃঙ্খলা ও সমন্বয় বেড়েছে। সম্প্রতি দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের সব ইউনিটে কর্মসূচি পালিত হওয়াকেও এর অন্যতম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন নেতা-কর্মীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘ সময় পর এত ব্যাপকভাবে দলীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি পালন তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক সক্ষমতার একটি নজির তৈরি করেছে।
দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর রুহুল কবির রিজভী নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তার মধ্যে দলীয় আদর্শ, গঠনতন্ত্র এবং দলের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকে নেতা-কর্মীদের বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, রিজভীর নির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা তৈরি করা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি সহনশীল আচরণ করা। দলের চেয়ারম্যান দেশের অর্থের অপচয় রোধে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেগুলো অনুসরণ করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্যও নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে অসহায়, দরিদ্র ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মানবিক অবস্থান অনুসরণ করে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতাবলম্বীর বিরুদ্ধে অযথা আক্রমণাত্মক বক্তব্য না দিয়ে সহনশীলতা প্রদর্শনের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এমনকি সমালোচকদের কাছ থেকেও দেশের কল্যাণে পরামর্শ নেওয়ার মানসিকতা তৈরির কথা বলা হয়েছে বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন।
নেতা-কর্মীদের বলা হয়েছে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও কোনো সাধারণ নাগরিক যেন বিএনপির নেতা-কর্মীদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। বরং মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়ে দলের প্রতি আস্থা তৈরি করতে হবে। দলের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করে কেউ যাতে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার নির্দেশনা রয়েছে।
তৃণমূলের কয়েকজন নেতা-কর্মীর দাবি, অতীতে বিচ্ছিন্ন কিছু কর্মকাণ্ডের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে। নতুন নির্দেশনার ফলে এ ধরনের তৎপরতা অনেকটাই কমেছে। নেতা-কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও ঐক্যও বেড়েছে। ফলে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল। দলের কোটি কোটি সমর্থক, কর্মী ও নেতা এখন ঐক্যবদ্ধ। তারা দল ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে প্রস্তুত আছেন এবং কাজ করছেন।”
দলীয় নেতা-কর্মীদের মতে, কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের পাশে থাকার যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা গেলে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে।